ভারতের আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত আইসিসি বোর্ড সভায় ক্রিকেট বিশ্বের জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রোববার এই সভায় টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ, নারী ক্রিকেটের উন্নয়ন, সহযোগী দেশগুলোর অংশগ্রহণ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের নিয়মকানুন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। আইসিসি ১ জুন এসব সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে নতুন উৎসাহ সঞ্চার করেছে। এই পরিবর্তনগুলো কেবল খেলার গতি বাড়াবে না, বরং আরও আকর্ষণীয় ও ন্যায্য করে তুলবে খেলাটিকে।
টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের সমস্যা আলোকস্বল্পতা নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসি। এখন থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্লাডলাইটের আলোয় গোলাপি বল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগে আলো কমে গেলে খেলা বন্ধ হয়ে যেত, যা ম্যাচের ফলাফলকে প্রভাবিত করত। নতুন নিয়মে দুই দলের আগাম সম্মতি সাপেক্ষে লাল বলের পরিবর্তে গোলাপি বল ব্যবহার করে খেলা চালিয়ে যাওয়া যাবে।
বিজ্ঞাপন
এতে করে টেস্ট ম্যাচগুলো আরও বেশি সময় খেলা হবে এবং দর্শকরা পুরো ম্যাচ উপভোগ করতে পারবেন। আইসিসি এ বিষয়ে আরও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করবে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি)-এর সাথে যৌথভাবে। এই পরিবর্তন ক্রিকেটের ঐতিহ্যবাহী ফরম্যাটকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে আরও টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
অবৈধ বোলিং অ্যাকশন শনাক্তকরণে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও অনুমোদিত হয়েছে। হক-আই প্রযুক্তি এখন মাঠের আম্পায়ারদের সরাসরি সাহায্য করবে। এতে করে বোলারদের অ্যাকশন দ্রুত এবং সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে, যা খেলার ন্যায্যতা বাড়াবে। এর আগে এ প্রক্রিয়া ছিল সময়সাপেক্ষ এবং জটিল।
টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটকে আরও দ্রুত ও আকর্ষণীয় করতে ইনিংসের মাঝের বিরতি ২০ মিনিট থেকে কমিয়ে ১৫ মিনিট করা হয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে ইতোমধ্যে এই ছোট বিরতি চালু আছে, যা ম্যাচের গতি ধরে রাখে। দর্শকদের জন্য এটি আরও উপভোগ্য হবে, বিশেষ করে টেলিভিশন সম্প্রচারে। পাশাপাশি পানির বিরতিতে কোচদের মাঠে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা কৌশলগত দিক থেকে দলগুলোকে সাহায্য করবে।
লেগ-সাইড ওয়াইড সংক্রান্ত পরীক্ষামূলক নিয়মকে স্থায়ী করা হয়েছে। এমসিসির নতুন আইনগুলো আইসিসি অনুমোদন দিয়েছে, যা ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে। এমসিসি ৭৩টি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে তাদের আইনে, যার মধ্যে মাল্টি-ডে ম্যাচের শেষ ওভার চালিয়ে যাওয়া, ব্যাটের নিয়ম ইত্যাদি রয়েছে। এসব পরিবর্তন ক্রিকেটকে আরও সহজবোধ্য ও ন্যায্য করে তুলবে।
বিজ্ঞাপন
নারী ক্রিকেটের উন্নয়নে আইসিসি বিশেষ নজর দিয়েছে। নারীদের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ২০২৭ সালের জুন-জুলাইয়ের পরিবর্তে ফেব্রুয়ারিতে আয়োজন করা হবে। এতে করে খেলার সময়সূচি আরও ভালো হয়েছে। প্রথমবারের মতো ১০ দল নিয়ে উইমেন্স ইমার্জিং নেশনস ট্রফি আয়োজন করা হবে। এতে পাঁচটি পূর্ণ সদস্য দেশ (যেমন শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড) এবং পাঁচটি সহযোগী দেশ অংশ নেবে। এটি সহযোগী দেশের নারী ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়াবে এবং প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হবে।
নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৮-এর বাছাই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য এই আসরে ভারতের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আয়োজন করা হবে, যা রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সহযোগী দেশগুলোর ক্রিকেট উন্নয়নেও জোর দেওয়া হয়েছে। তবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। গুরুতর প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক অনিয়মের অভিযোগে ক্রিকেট কানাডার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে। তবে কানাডার খেলোয়াড়দের স্বার্থে জাতীয় দল আইসিসি টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারবে এবং নির্দিষ্ট শর্তে তহবিলও পাবে। এই সিদ্ধান্ত ক্রিকেটের সুশাসন ও সততা নিশ্চিত করবে।
এসব সিদ্ধান্ত ক্রিকেটকে আরও জনপ্রিয় করবে। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য গোলাপি বলের ব্যবহার দিন-রাতের খেলাকে আরও সহজ করবে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এতে করে টেস্ট ফরম্যাটের জনপ্রিয়তা বাড়বে, বিশেষ করে যেসব দেশে আলোকস্বল্পতা সমস্যা বেশি। হক-আই-এর ব্যবহার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে বিতর্ক কমাবে এবং খেলোয়াড়দের মানসিক চাপও হ্রাস পাবে।
নারী ক্রিকেটে ১০ দলের ইমার্জিং ট্রফি নতুন প্রতিভা তুলে আনবে। বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো দেশের নারী দলগুলো এতে উপকৃত হবে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সাথে আন্তর্জাতিক ফরম্যাটের সমন্বয়ও এসব সিদ্ধান্তে লক্ষণীয়। টি-টোয়েন্টির ছোট বিরতি খেলাকে টেলিভিশন ফ্রেন্ডলি করবে।
আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ বলেন, ‘আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনাগুলো বৈশ্বিক ক্রিকেটের সুশাসন, প্রশাসনিক উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণে আইসিসির অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। নারী ক্রিকেট, উদীয়মান দেশ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট সব ক্ষেত্রেই নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো ক্রিকেটকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও আকর্ষণীয় করে তুলবে।’
আহমেদাবাদের এই সভা আইপিএল ফাইনালের সময় হওয়ায় অনেক প্রশাসক উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড চেয়ারম্যান মোহসিন নাকভি ভার্চুয়ালি যোগ দেন। সভায় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও বিস্তারিত এখনও প্রকাশিত হয়নি।




