সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্বকাপের বাকি ১৭ দিন

মৃত্যুকূপ নাকি মিরাকলের মঞ্চ? গ্রুপ ‘এ’ ঘিরে উত্তেজনা

প্রকাশিত: ২৫ মে ২০২৬, ০১:১২ পিএম

শেয়ার করুন:

মৃত্যুকূপ নাকি মিরাকলের মঞ্চ? গ্রুপ ‘এ’ ঘিরে উত্তেজনা

ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী গ্রুপটাই এবার যেন একটা রোমাঞ্চকর থ্রিলার। গ্রুপ 'এ' যেখানে চারটি দলের শক্তির ব্যবধান খুবই কম। স্বাগতিক মেক্সিকোর ঘরের মাঠের সুবিধা, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যাবর্তন, সন হিউং মিনের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ আর চেকিয়ার নাটকীয় যোগ্যতা অর্জন। সব মিলিয়ে এই গ্রুপকে অনেকেই বলছেন এটি ‘মৃত্যুকূপ’। যেখানে একটা ভুলের মাশুল দিতে হয় পুরো টুর্নামেন্ট দিয়ে। আবার কেউ বলছেন, এটি ‘মিরাকলের মঞ্চ’ যেখানে অপ্রত্যাশিত নায়কের জন্ম হয়, যেখানে ফুটবল তার সবচেয়ে সুন্দর রূপে দেখা দেয়।

একদিকে আয়োজকের উন্মাদ সমর্থন আর ঐতিহ্যের ভার, অন্যদিকে এশিয়ান টাইগারদের অদম্য মনোবল, আফ্রিকান গ্রিটের দুর্দান্ত শারীরিক শক্তি এবং ইউরোপিয়ান কৌশলের ঠান্ডা হিসাব। ৪৮ দলের এই বিশাল আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই শুরু হবে নির্মম লড়াই। শীর্ষ দুই দল সরাসরি নকআউটে, তৃতীয় স্থানের সেরা দলগুলোও পাবে দ্বিতীয় সুযোগ। 


বিজ্ঞাপন


এই গ্রুপে লুকিয়ে আছে ২০০২-এর দক্ষিণ কোরিয়ার মিরাকলের ছায়া, ২০১০-এর আফ্রিকান গ্রিটের স্মৃতি, মেক্সিকান উন্মাদনার ঐতিহ্য এবং চেক টেকনিক্যাল দক্ষতার ঠান্ডা আগুন।  কে উঠবে শেষ ষোলোয়? কে লিখবে নতুন ইতিহাস? আর কে ফিরবে ঘরে হতাশায়? ১১ জুন ২০২৬ থেকে শুরু হবে এই মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায়। গ্রুপ ‘এ’ মৃত্যু না মিরাকল, সেটা সময়ই বলে দেবে।

মেক্সিকো: আয়োজকের চাপ ও ঐতিহ্য

মেক্সিকো তিনবার বিশ্বকাপ আয়োজন করছে ১৯৭০, ১৯৮৬ এবং এবার ২০২৬। তারা ১৮ বার বিশ্বকাপে খেলেছে, যা অনেক ঐতিহ্যবাহী দলের চেয়ে বেশি। সেরা সাফল্য কোয়ার্টার ফাইনাল (১৯৭০ ও ১৯৮৬, দুটোতেই স্বাগতিক হিসেবে)। সামগ্রিক রেকর্ড: ৬০ ম্যাচে ১৭ জয়, ১৫ ড্র, ২৮ হার।

ঘরের মাঠে (বিশেষ করে এস্তাদিও অ্যাজটেকায়) মেক্সিকো অপরাজেয়ের মতো। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসে ‘রাউন্ড অব ১৬ কার্স’ তাদের তাড়া করেছে ২০২২-এ গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়। এবার স্বাগতিক সুবিধা, উন্মাদ সমর্থন এবং তরুণ প্রতিভার সমন্বয়ে তারা অন্তত কোয়ার্টার ফাইনালের লক্ষ্য নিয়ে নামবে। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে তারা প্রায় ১৫তম স্থানে। গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে তাদের ফেভারিট মানা হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


দক্ষিণ কোরিয়া: এশিয়ান টাইগার্সের মিরাকল লিগ্যাসি

দক্ষিণ কোরিয়া ১১ বার বিশ্বকাপে খেলেছে। এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ২০০২-এ স্বাগতিক হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে (চতুর্থ স্থান) ইতিহাস গড়েছিল। ইতালি ও স্পেনকে হারিয়ে তারা দেখিয়েছিল ‘মিরাকল’ কীভাবে সম্ভব। সামগ্রিক রেকর্ড ৩৮ ম্যাচে ৭ জয়, ১০ ড্র, ২১ হার।

সন হিউং-মিনের মতো তারকা, দ্রুতগতির আক্রমণ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ ডিফেন্স, কোরিয়া সবসময়ই চমক দেয়। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রায় ২২তম। মেক্সিকোর বিপক্ষে তাদের ম্যাচ হবে গ্রুপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি। কোরিয়া যদি একটা অঘটন ঘটায়, তাহলে পুরো গ্রুপের সমীকরণ বদলে যাবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা: বাফানা বাফানার প্রত্যাবর্তন

বাফানা বাফানা ২০১০-এ স্বাগতিক হিসেবে খেলেছিল, কিন্তু গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়ে প্রথম স্বাগতিক দল হিসেবে সেই ‘কলঙ্ক’ পেয়েছিল। এবার ১৬ বছর পর ফিরেছে। তিনবার বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা (১৯৯৮, ২০০২, ২০১০)। সেরা সাফল্য গ্রুপ পর্ব। ফিফা র‍্যাঙ্কিং প্রায় ৬০তম।

তবে আফ্রিকান ফুটবলের গ্রিট, শারীরিক শক্তি এবং কাউন্টার অ্যাটাক এগুলো দিয়ে তারা যেকোনো দলকে বিপাকে ফেলতে পারে। হুগো ব্রুসের অধীনে তারা যোগ্যতা অর্জন করেছে এবং এবার ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

চেকিয়া: ঐতিহাসিক গৌরবের নতুন অধ্যায়

চেকিয়া (পূর্বতন চেকোস্লোভাকিয়া) বিশ্বকাপে দুইবার রানার্সআপ (১৯৩৪, ১৯৬২)। চেকোস্লোভাকিয়া হিসেবে ৮ বার খেলেছে। স্বাধীন চেক রিপাবলিক হিসেবে ২০০৬-এ শেষবার খেলে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়। ২০ বছর পর ফিরেছে প্লে-অফ জিতে। ফিফা র‍্যাঙ্কিং প্রায় ৪১তম।

ইউরোপিয়ান কাঠিন্য, কৌশলগত দক্ষতা এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে চেকিয়া কঠিন প্রতিপক্ষ। তারা যদি সংগঠিত খেলে, তাহলে পয়েন্ট ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব।

গ্রুপ অব ডেথের উত্তরাধিকার

‘গ্রুপ অব ডেথ’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে। ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, চেকোস্লোভাকিয়া ও রোমানিয়ার গ্রুপ। ১৯৮২-এ আর্জেন্টিনা, ইতালি, ব্রাজিলের গ্রুপও ছিল মারাত্মক। ২০১৪-এ স্পেন, নেদারল্যান্ডস, চিলি ও অস্ট্রেলিয়ার গ্রুপ বি ছিল সাম্প্রতিক উদাহরণ।

গ্রুপ এ-কে পুরোপুরি ‘ডেথ’ বলা যায় না, কারণ কোনো সুপার পাওয়ার নেই। কিন্তু এর ভারসাম্যই এটাকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। মেক্সিকো ফেভারিট, কিন্তু কোরিয়া ও চেকিয়া যেকোনো ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকা শারীরিকভাবে শক্তিশালী।

পরিসংখ্যান বলছে, গড় এলো রেটিংয়ে এই গ্রুপ মাঝারি কঠিন। কিন্তু ফুটবলে পরিসংখ্যান সবসময় সত্যি হয় না। একটা পেনাল্টি, একটা রেড কার্ড বা একটা অসাধারণ গোল পুরো চিত্র বদলে দিতে পারে।

গ্রুপ এ হতে পারে মৃত্যুকূপ। যেখানে একটা ভুলের মাশুল দিতে হয়; অথবা মিরাকলের মঞ্চ, যেখানে অপ্রত্যাশিত নায়ক জন্ম নেয়। মেক্সিকো সম্ভবত শীর্ষে থাকবে, কিন্তু দ্বিতীয় স্থানের জন্য লড়াই হবে তীব্র। দক্ষিণ কোরিয়া বা চেকিয়া যদি কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে, তাহলে সেটা হবে নতুন ইতিহাস।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর