বাস্তব জীবন যে মাঝে মাঝে রূপালী পর্দার গল্পকেও হার মানায়, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্রাজিলের নতুন ফুটবল সেনসেশন ইগর থিয়াগো। এক সময় ব্রাসিলিয়ার ফুটপাতে মায়ের মুখে অন্ন জোগাতে রাজমিস্ত্রি বা বাজার বিক্রেতার কাজ করা সেই তেরো বছরের কিশোরই এখন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর মাটিতে অনুষ্ঠেয় ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিখ্যাত 'হলুদ-সবুজ' জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে প্রস্তুত। কোচ কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বজয়ের ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ফুটবল বিশ্বে এখন আলোচনার তুঙ্গে ব্রেন্টফোর্ডের এই গোলমেশিন।
ব্রাজিলের গামা শহরের এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ইগরের জীবনটা কখনোই সহজ ছিল না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মা মারিয়া দিভা এবং ভাই মাইকনের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বুকে চেপে বেঁচে থাকার তাগিদে কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে খেটেছেন, কখনো হাটে হাটে সবজি বেচেছেন, আবার কখনো গাড়ি ধুয়েছেন। কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাটা মরে যেতে দেননি। সিবিএফ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইগর আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "ছোটবেলার সেই কঠিন কাজগুলোই আজ আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে, জীবনের সাধারণ জিনিসগুলোর মূল্য দিতে শিখিয়েছে।"
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন- আড়াই বছর পর নেইমারের প্রত্যাবর্তন, খোলা চিঠি আবেগপ্রবণ বাবার
আরও পড়ুন- মেসি-রোনালদো-নেইমারসহ বিশ্বকাপে নজর থাকবে যাদের উপর
সিবিএফ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "ছোটবেলায় আমি বাজারে কাজ করেছি, লিফলেট বিলি করেছি, গাড়ি ধুয়েছি এবং অনেক জমি পরিষ্কার করার কাজ করেছি। আমি রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবেও কাজ করেছি। আমি অনেক ধরনের কাজ করেছি এবং আমি মনে করি সেই কাজগুলোই আজ আমাকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে; আমার চরিত্র গঠন করেছে, জীবনের সাধারণ জিনিসগুলোর মূল্য দিতে শিখিয়েছে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে কীভাবে উপভোগ করতে হয় তা শিখিয়েছে।"

বিজ্ঞাপন
ইগরের প্রতিভার প্রথম খোঁজ পান সাবেক ফুটবলার টিকো। শুরুতে অ্যাথলেটিকো পারানায়েন্সের ট্রায়ালে বাদ পড়লেও টিকোর পরামর্শে পারানার ছোট ক্লাব 'ভেরে'-তে যোগ দেন তিনি। সেখানে অনূর্ধ্ব-১৭ টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নজরে আসেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ক্রুজেইরোর। পেশাদার চুক্তি সই হলেও বড় ক্লাবের আকাশচুম্বী চাপ আর সমর্থকদের ধৈর্যহীন সমালোচনা কিশোর ইগরকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
এ প্রসঙ্গে থিয়াগো বলেন, "ক্রুজেইরোতে থাকার সময়টা ছিল এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষের মতামত, সমালোচনা এবং প্রশংসা কীভাবে সামলাতে হয়, তা আমাকে অনেক বেশি শিখতে হয়েছিল। এটি ছিল এক মানসিক বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা। মানসিকভাবে আমি তখন ভালো অবস্থায় ছিলাম না। ক্রুজেইরো কিংবা ক্লাবের বাইরের মানুষ—কেউই এটা বুঝতে পারছিল না যে ১৭, ১৮ বা ১৯ বছরের একটি ছেলের জন্য পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার একটা সময়ের প্রয়োজন থাকে। তারা আমার ওপর অন্যরকম এক চাপ তৈরি করেছিল। ক্লাবের তখন গোল করার জন্য একজন স্ট্রাইকার খুব দরকার ছিল। ফলে তাদের ধৈর্যের অভাব ছিল এবং আমি যে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় খুঁজছিলাম, তা বোঝার মানসিকতা ছিল না।" পরবর্তীতে ক্লাবের আর্থিক অনটনের কারণে মাত্র ৭৪ লক্ষ রিয়ালে তাকে বুলগেরিয়ার ক্লাব লুদোগোরেতসের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
বুলগেরিয়া থেকে বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুজ হয়ে ২০২৪ সালে প্রায় ২১ কোটি রিয়ালের রেকর্ড ট্রান্সফারে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডে যোগ দেন ইগর। আর ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখতেই খোলস ছেড়ে বের হন এই স্ট্রাইকার। প্রিমিয়ার লিগের চলতি মৌসুমে ব্রেন্টফোর্ডের হয়ে ২২টি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আর্লিং হালান্ডের (২৬ গোল) ঠিক পেছনেই অবস্থান করছেন তিনি।
প্রিমিয়ার লিগে এই দলবদলই মূলত স্ট্রাইকার ইগরকে ব্রাজিল জাতীয় দলের রাডারে নিয়ে আসে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল লিগে থিয়াগোর নজরকাড়া পারফরম্যান্স এড়াতে পারেননি ব্রাজিলের মাস্টারমাইন্ড কোচ কার্লো আনচেলত্তি। বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে সেলেসাওদের মূল দলে ডাক পান ইগর। ইতোমধ্যে দেশের হয়ে দুটি ম্যাচ খেলে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটিও পেয়েছেন তিনি। শৈশবের সেই ছেঁড়া বুট আর পেটের ক্ষুধা জয় করে ইগর থিয়াগো এখন ব্রাজিলের হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) মিশনের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি।




