বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই উন্মাদনা, আবেগ আর লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বপ্ন। আর যখন এই বড় আসর নিজের দেশের মাঠে হয়, তখন স্বাগতিক দলের জন্য পরিস্থিতি দ্বিমুখী হয়ে যায়। একদিকে নিজের মাঠের সুবিধা, পরিচিত আবহাওয়া, সমর্থকদের অসম্ভব উৎসাহ। এগুলোকে বলা হয় বড় আশীর্বাদ। অন্যদিকে পুরো দেশের প্রত্যাশার বিশাল চাপ, যেকোনো ভুলের ফলে যা পুরো জাতিকে হতাশায় ডুবিয়ে দিতে পারে। ফিফা বিশ্বকাপের ১৯৩০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ২২টি আসরের ইতিহাস দেখলে এই দ্বৈত চরিত্রটা স্পষ্ট হয়।
ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্বাগতিক দল ৬ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এটি মোটেও ছোট সাফল্য নয়। প্রথম বিশ্বকাপেই উরুগুয়ে ১৯৩০ সালে নিজের মাঠে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৩৪ সালে ইতালি ঘরের মাঠে ট্রফি জিতে। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড ওয়েম্বলিতে জার্মানিকে অতিরিক্ত সময়ে ৪-২ গোলে হারিয়ে একমাত্র বিশ্বকাপ ঘরে তোলে। ১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মানি, ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা এবং সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স (জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে) ঘরের মাঠে চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর আর কোনো স্বাগতিক দল চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন

এছাড়া অনেক স্বাগতিক দল ভালো ফল করেছে। ব্রাজিল ১৯৫০ সালে রানার্স-আপ হয়, সুইডেন ১৯৫৮ সালে ফাইনালে উঠে। চিলি ১৯৬২ সালে তৃতীয়, জার্মানি ২০০৬ সালে তৃতীয় এবং দক্ষিণ কোরিয়া ২০০২ সালে চতুর্থ স্থানে শেষ করে। মেক্সিকো, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ডসহ অনেক দেশই কোয়ার্টার ফাইনাল বা তার আগে ভালো খেলেছে। সাধারণত দেখা যায়, ঘরের মাঠে দলগুলো তাদের সেরা পারফরম্যান্স দেখায়। কারণ পরিচিত পরিবেশে খেলোয়াড়দের ক্লান্তি কম হয়, ভ্রমণের ঝামেলা থাকে না এবং স্টেডিয়ামে প্রায় পুরোটা সমর্থন থাকে।

কিন্তু সবসময় গল্পটা এত সুন্দর নয়। চাপের উদাহরণও কম নয়। সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ আফ্রিকা (২০১০) এবং কাতার (২০২২) গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। এটাই স্বাগতিকদের সবচেয়ে খারাপ ফলাফল। স্পেন ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় রাউন্ডে আটকে যায়। যুক্তরাষ্ট্র (১৯৯৪) এবং জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া (২০০২) শেষ ষোলোতে থেমে যায়। ঘরের সমর্থন যেমন খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করে, তেমনি একটা হার বা খারাপ পারফরম্যান্স পুরো দেশের চাপে পরিণত হয়। খেলোয়াড়রা প্রায়ই বলেন, 'নিজের দেশের জার্সিতে খেলা সবচেয়ে বড় সম্মান, কিন্তু সবচেয়ে বড় চাপও বটে।'
বিজ্ঞাপন
আধুনিক ফুটবলে (২০০০ সালের পর) প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। দলগুলো আরও শক্তিশালী ও পেশাদার হয়েছে। তাই স্বাগতিক সুবিধা থাকলেও চ্যাম্পিয়ন হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে ইতিহাস বলছে, স্বাগতিক দল গড়পড়তার চেয়ে ভালো করে, এটাই তাদের বড় শক্তি।
আসছে ২০২৬ বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করবে। তিন দেশের মধ্যে কেউ কি ট্রফি জিততে পারবে? ইতিহাসের আলোকে সম্ভাবনা আছে, কিন্তু চাপও থাকবে প্রচণ্ড। যে দল এই চাপকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারবে এবং মানসিকভাবে শক্ত থাকবে, তারাই ইতিহাস গড়বে।




