ফুটবল বিশ্বকাপ ক্রীড়াপ্রেমী থেকে সাধারণ মানুষের আবেগের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। কিন্তু এই মঞ্চে শুধু গোল, উদযাপন আর রূপকথাই নয় ঘটেছে অগণিত বিতর্ক, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সন্দেহজনক রেফারিং, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন। প্রতি আসরেই কোনো না কোনো অধ্যায় আলোচনায় থেকে যায় বছরের পর বছর। ফিফার ইতিহাসে এমন কিছু বিতর্কিত মুহূর্ত রয়েছে যা ফুটবলপ্রেমীদের আজও নাড়া দেয়। তেমনি এক আসর ১৯৩৪ ফুটবল বিশ্বকাপ।
১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প। যেখানে ফুটবলের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল রাজনীতি, ফ্যাসিবাদ ও ক্ষমতার প্রদর্শন। মহামন্দার ধাক্কায় যখন পুরো বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটে, তখন ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনি বিশ্বকাপকে ব্যবহার করেছিলেন নিজের শাসনের শক্তি ও ফ্যাসিবাদী আদর্শ প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে।
বিজ্ঞাপন
এটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী আসরগুলোর একটি। আয়োজক দেশ ইতালিকেও বাছাইপর্ব খেলতে হয়েছিল। একই সঙ্গে আগের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে অংশই নেয়নি। ইউরোপীয় দেশগুলো ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে যেতে না চাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা বিশ্বকাপ বর্জন করে। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও আয়ারল্যান্ডও বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। সে সময় ইংল্যান্ডের ফুটবল প্রশাসক চার্লস এডওয়ার্ড সাটক্লিফ বিশ্বকাপকে গুরুত্বহীন বলে মন্তব্য করেছিলেন। তার ভাষায়, 'হোম নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপই আসল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, রোমে যা হচ্ছে তা নয়।'
অন্যদিকে মুসোলিনি ফুটবলকে সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের বড় মাধ্যম মনে করতেন। বিশ্বকাপ ঘিরে ইতালিজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় লাখ লাখ পোস্টার, ডাকটিকিট ও ফ্যাসিবাদী প্রতীক। এমনকি বিশেষ সিগারেট ব্র্যান্ডও বাজারে আনা হয়েছিল বিশ্বকাপের নামে।
বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আফ্রিকা থেকে অংশ নেয় মিশর। তবে পুরো টুর্নামেন্টই ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনায় ভরা। অনেক দেশ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণে অংশ নেয়নি কিংবা বাছাইপর্ব থেকে সরে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞাপন
ইতালিকে টুর্নামেন্টটির ভেন্যু হিসেবে নির্বাচিত করতে ফিফার ওপর চাপ প্রয়োগও করেছিলেন মুসোলিনি। আজ্জুরিদের (ইতালির জাতীয় ফুটবল দলের উপনাম) চ্যাম্পিয়ন করতে অবলম্বন করেছিলেন নানা বিতর্কিত ও কুখ্যাত পন্থার। প্রতিটি ম্যাচের রেফারি নির্বাচন করতেন নিজে। অভিযোগ আছে, স্বাগতিকদের নানা সুবিধা প্রদানের জন্য প্ররোচিত করা হতো তাদের।
১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপকে জাতীয়তাবাদ প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বেনিতো মুসোলিনি। ফুটবল ইতিহাসভিত্তিক দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন বই ও গবেষণা এবং ইউরোপের বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ আছে, ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত চলাকালে জার্মানি ও ইতালির খেলোয়াড়েরা তথাকথিত 'রোমান স্যালুট' প্রদর্শন করেছিল। তবে শুধু এই দুই দলই নয়, টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া প্রায় সব দলকেই সেই অভিবাদন জানাতে বাধ্য করা হয়েছিল।
এই স্যালুটই পরে 'ফ্যাসিস্ট স্যালুট; বা 'নাৎসি স্যালুট' নামে পরিচিতি পায়। এর ধরন ছিল ডান হাত সামনের দিকে পুরোপুরি প্রসারিত করা, হাতকে খানিকটা উঁচুতে রাখা এবং পাঁচ আঙুল একসঙ্গে মিলিয়ে করতল সামান্য নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখা। হিটলার ও মুসোলিনির শাসনামলে এই অঙ্গভঙ্গি এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ তাই শুধু ফুটবলের আসর ছিল না, বরং ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রচারণারও একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
মাঠের খেলাতেও বিতর্ক কম ছিল না। কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালি ও স্পেনের ম্যাচ আজও ইতিহাসের অন্যতম সহিংস ম্যাচ হিসেবে পরিচিত। ম্যাচে একের পর এক খেলোয়াড় আহত হন। স্পেনের কিংবদন্তি গোলরক্ষক রিকার্ডো জামোরা পরে বলেছিলেন,'ইতালি ও স্পেনের ম্যাচটাই আসলে ফাইনাল হওয়ার যোগ্য ছিল। আমরা ছিলাম সেরা দুই দল।'
প্রথম ম্যাচ ১-১ ড্র হওয়ার পরদিনই পুনরায় ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ক্লান্ত ও ইনজুরিতে জর্জরিত স্পেনকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে ইতালি। সেই ম্যাচের রেফারিং নিয়েও পরে বহু বিতর্ক তৈরি হয়। সেমিফাইনালে ইতালি হারায় অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত 'ওয়ান্ডারটিম'কে। অন্যদিকে চেকোস্লোভাকিয়া ফাইনালে ওঠে জার্মানিকে হারিয়ে।
ফাইনালের আগেই রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ে। চেকোস্লোভাকিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোটের ঘোষণা দেয়, যা ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা হয়। ফলে ফাইনাল অনেকের কাছে শুধু ফুটবল ম্যাচ ছিল না; বরং ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজমের প্রতীকী লড়াইয়ে পরিণত হয়।
রোমের স্টাডিও নাজিওনালে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ৬৫ হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত ছিলেন। ম্যাচের শেষ দিকে চেকোস্লোভাকিয়া এগিয়ে গেলেও ইতালির রাইমুন্ডো ওরসি সমতা ফেরান। অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঞ্জেলো স্কিয়াভিওর গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি।
‘ইল দুচে’ হিসেবে খ্যাত মুসোলিনি বিশ্ববাসীর সামনে ফ্যাসিবাদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আজ্জুরিরা ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর শুধু জুলে রিমে ট্রফি নয়, আরও একটি বিশালাকার ট্রফি পেয়েছিল। মুসোলিনির নির্দেশে তৈরি এই ‘কোপা ডেল দুচে’ ছিল জুলে রিমে ট্রফির চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বড়। ব্রোঞ্জের আবরণে মোড়ানো এই ট্রফি বহন করছিল ফ্যাসিবাদী প্রচারের স্পষ্ট বার্তা।
টুর্নামেন্টজুড়ে মুসোলিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, ইতালির বিজয় যেন শুধু খেলার মাঠের সাফল্য না হয়ে ওঠে বরং তা যেন তার শাসনব্যবস্থার প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কোপা ডেল দুচে ট্রফি ছিল সেই প্রচেষ্টারই এক উজ্জ্বল প্রতীক। চারজন লোক মিলে বহন করতে হয়েছিল এই বিশাল ট্রফি।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মাত্র চার দিন পর ভেনিসে প্রথমবার সাক্ষাৎ করেন অ্যাডলফ হিটলার ও বেনিতো মুসোলিনি। ইতিহাসবিদদের মতে, সেই বৈঠক থেকেই পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তির ভিত্তি তৈরি হয়।
সুত্র- নিউইয়র্ক টাইমস, ইএসপিএন ফুটবল, গার্ডিয়ান
এসটি




