শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্বকাপের বাকি ২৭ দিন

ফ্রান্সের অধিনায়ক যখন নাৎসি বাহিনীর খুনী, অতঃপর ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্য

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ফ্রান্সের অধিনায়ক যখন নাৎসি বাহিনীর খুনী, অতঃপর ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্য

ফুটবল মাঠে তিনি একসময় দেশের গৌরব বয়ে এনেছিলেন, সেই তিনিই পরে মেতে উঠেছিলেন এক পৈশাচিক রক্তখেলায়। বিশ্বকাঁপানো এক মহাতারকার এমন চরম পতন ভাবলে আজও শিউরে ওঠে মানুষ। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে মাঠে যিনি অধিনায়ক হিসেবে ফ্রান্সের পতাকা নিয়ে গর্বের সাথে হেঁটেছিলেন, মাত্র ১৪ বছরের ব্যবধানে সেই একই মানুষটির কপালে জোটে ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতকের তকমা। মাঠের রূপকথার চেয়েও ভয়ংকর তার সেই বাস্তব জীবনের করুণ ও নৃশংস পরিণতি।

মাঠের সবুজ ঘাস থেকে রক্তমাখা ফায়ারিং স্কোয়াড- তার জীবনের গতিপথ এতটাই রুদ্ধশ্বাস যে কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানাবে। ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের রাজপুত্র আলেক্স ভিলাপ্লেনের কাহিনী শুনলে তাই ‘খলনায়ক’ শব্দটাকেও মনে হয় তুচ্ছ।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন- ১৯৫০ বিশ্বকাপ: ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গের নাম ‘মারাকানাজো’

আরও পড়ুন- ত্রি-আয়োজকের মাটিতে আসছে রেকর্ডময় বিশ্বকাপ

১৯০৫ সালে আলজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া ভিলাপ্লেন ছিলেন ফরাসি ফুটবলে এক নতুন অধ্যায়ের নাম। উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভূত প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনি যখন ফ্রান্সের নীল জার্সি গায়ে চাপান, তখন পুরো দেশ তাকে নিয়ে মাতোয়ারা। মাঠের মাঝখানে তার দাপট ছিল দেখার মতো। দুর্দান্ত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ যেমন রুখতেন, তেমনি নিখুঁত সব পাসে সতীর্থদের গোল করতে সাহায্য করতেন। তাকে বলা হতো সে সময়ের সেরা ‘হেডার’।

১৬ বছর বয়সে তিনি তার চাচাদের সাথে থাকার জন্য আলজেরিয়া থেকে দক্ষিণ উপকূলে চলে আসেন এবং স্থানীয় ক্লাব এফসি সেতেতে যোগ দেন। ক্লাবটির স্কটিশ খেলোয়াড়-ম্যানেজার ভিক্টর গিবসন তার প্রতিভা চিনতে পারেন এবং দ্রুত তাকে প্রথম একাদশে সুযোগ করে দেন। সে সময় দেশে পেশাদার ফুটবলের অনুমতি ছিল না, তবুও ক্লাবগুলো খেলোয়াড়দের অর্থ প্রদানের পথ খুঁজে বের করত এবং ১৯২৭ সালে ভিলাপ্লেনকে একটি নকল চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব নিমস। এই প্রলোভনে নিমসে যোগ দেন ভিলাপ্লেন যেখান থেকে তিনি মোটা অঙ্কের বেতন পেতেন।


বিজ্ঞাপন


তার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত আসে ১৯৩০ সালে। ইতিহাসের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন ফ্রান্সের অধিনায়ক। মন্টিভিডিওর মাঠে মেক্সিকোকে হারিয়ে ফ্রান্স যখন জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করল, ভিলাপ্লেন তখন সাফল্যের চূড়ায়। তিনি নিজেই বলেছিলেন, সেটি ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। কিন্তু কে জানত, এই সোনালি ট্রফির আড়ালে এক ভয়ানক অন্ধকার লুকিয়ে ছিল!

সাফল্যের সাথে সাথে ভিলাপ্লেনের নেশা চড়ে যায় বিলাসবহুল জীবন আর জুয়ার আড্ডায়। ১৯২৯ সালে তৎকালীন সবচেয়ে ধনী ক্লাব ‘রেসিং ক্লাব ডি প্যারিস’-এ যোগ দিয়ে তিনি যে পরিমাণ অর্থ কামাতে শুরু করেন, তা তখনকার দিনে ছিল অকল্পনীয়। বার, ক্যাবারে আর ঘোড়দৌড়ের মাঠে তার আনাগোনা বাড়তে থাকে।

১৯৩২ সালে ফ্রান্সে পেশাদার ফুটবল শুরু হওয়ার পর তার আসল রূপ বেরিয়ে আসে। ম্যাচ ফিক্সিং বা পাতানো খেলার সাথে তার নাম জড়িয়ে পড়ে। মাঠের সেই ক্ষিপ্র ‘ডায়নামো’ খেলোয়াড়টি ধীরে ধীরে অলস আর অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। ট্রেনিং ফাঁকি দেওয়া আর শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে একের পর এক ক্লাব থেকে তিনি বিতাড়িত হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৫ সালে ঘোড়দৌড়ে জালিয়াতির দায়ে জেলে গেলে ফুটবলের দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে নাৎসি জার্মানরা যখন প্যারিস দখল করে, ভিলাপ্লেন তখন তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর খেলাটি শুরু করেন। যেখানে হাজারো মানুষ দিশেহারা, সেখানে তিনি খুঁজছিলেন আখের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ। তিনি হাত মেলান হেনরি লাফন্ট নামে এক কুখ্যাত দুষ্কৃতকারীর সাথে। তারা মিলে গড়ে তোলেন ‘ফ্রেঞ্চ গেস্টাপো’—যাদের কাজ ছিল নাৎসিদের হয়ে দালালি করা।

নাৎসিরা তাকে ‘এসএস সাব-লেফটেন্যান্ট’ পদ দেয়। এরপর তিনি গঠন করেন ‘উত্তর আফ্রিকান ব্রিগেড’ (BNA)। এই ইউনিটটি হয়ে ওঠে মূর্তিমান আতঙ্ক। তারা গ্রামের পর গ্রামে হানা দিয়ে সাধারণ ফরাসি আর ইহুদিদের ধরে ধরে নাৎসিদের হাতে তুলে দিত।

১৯৪৪ সালের জুন মাসের এক ঘটনা আজও ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে আছে। মুসিডান গ্রামের ১১ জন যুবককে বন্দি করে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারার আদেশ দেন ভিলাপ্লেন। বলা হয়, তিনি নিজেও নিজের হাতে ট্রিগার চেপেছিলেন। তিনি মানুষের সামনেই তাদের আত্মীয়দের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতেন এবং তা দেখে হাসতেন।

ভিলাপ্লেন শুধু একজন ঘাতকই ছিলেন না, ছিলেন এক চতুর প্রতারক। যুদ্ধের শেষ দিকে যখন তিনি বুঝতে পারলেন জার্মানি হারছে, তখন তিনি ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করেন। তিনি মাঝেমধ্যে বন্দিদের ছেড়ে দিয়ে ভাব দেখাতেন যে তিনি তাদের বাঁচাচ্ছেন।

প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল তার ‘আশার ব্ল্যাকমেইল’। তিনি ফরাসি গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে আক্ষেপ করে বলতেন, "হায়! কী এক কঠিন সময় এলো! ফরাসি হয়েও আমাকে জার্মান পোশাক পরতে হচ্ছে! আমি আপনাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু এই বর্বর নাৎসিরা তো আপনাদের মেরে ফেলবে। যদি আমাকে ৪ লক্ষ ফ্রাঁ দিতে পারেন, তবে আপনাদের জীবন আমি রক্ষা করব।" এভাবে মৃত্যুভয় দেখিয়ে অসংখ্য মানুষের শেষ সম্বলটুকুও তিনি কেড়ে নিতেন।

১৯৪৪ সালের আগস্টে প্যারিস মুক্ত হওয়ার পর ভিলাপ্লেনের সাজানো বাগান ধুলোয় মিশে যায়। তাকে ও তার গ্যাংকে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আদালতের প্রসিকিউটর তার নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, বলেছিলেন, "তারা লুটতরাজ করেছে, ধর্ষণ করেছে, ডাকাতি করেছে, হত্যা করেছে এবং জার্মানির সাথে হাত মিলিয়ে আরও জঘন্য অপরাধ ও ভয়াবহ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। তারা তাদের পেছনে আগুন আর ধ্বংসাবশেষ রেখে গেছে। একজন সাক্ষী আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে এই ভাড়াটে খুনিরা তাদের শিকারদের তখনও ছটফট করা রক্তমাখা দেহ থেকে অলঙ্কার ছিনিয়ে নিচ্ছে। ভিলাপ্লেন এই সবকিছুর মধ্যে ছিলেন শান্ত এবং হাস্যোজ্জ্বল। প্রফুল্ল, যেন প্রাণবন্ত।"

নিজের দেশ ও জাতির সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা আর হাজারো নিরপরাধ মানুষের কান্নার দায় নিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৪৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর, বড়দিনের আমেজ যখন পুরো পৃথিবীতে, তখন প্যারিসের উপকণ্ঠে ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে বিদীর্ণ হয়ে যায় আলেক্স ভিলাপ্লেনের দেহ।

যে পা দিয়ে তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতিহাস গড়েছিলেন, সেই হাত দিয়ে জঘন্যতম অপরাধ করে তিনি ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়ে গেলেন এক অভিশপ্ত ঘাতক হিসেবে। মাঠের হিরো থেকে মাঠের বাইরে এক পৈশাচিক খলনায়ক হওয়ার এমন করুণ পরিণতি ফুটবল বিশ্ব আর কখনো দেখেনি।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর