রোববার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

মঞ্জুর সামান্য শাস্তিতে অসন্তুষ্ট জাহানারা, কাঠগড়ায় রাজ্জাকও

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২০ এএম

শেয়ার করুন:

মঞ্জুর সামান্য শাস্তিতে অসন্তুষ্ট জাহানারা, কাঠগড়ায় রাজ্জাকও

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম জাতীয় দলে খেলার সময় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ তুলেছিলেন। সেই ঘটনায় সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। বিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখে। ২০২৫ সালে কমিটি গঠিত হয় এবং ২০২৬ সালের শুরুতে রিপোর্ট জমা পড়ে। 

তদন্তে জাহানারার চারটি অভিযোগের মধ্যে দুটির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। ফলে বিসিবি মঞ্জুরুল ইসলামকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করে। তবে এই শাস্তিকে অনেকে ‘হালকা’ বলে মনে করেন। জাহানারা নিজেও এতে সন্তুষ্ট নন।


বিজ্ঞাপন


সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় জাহানারা আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকর কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট অনুরোধ জানিয়েছেন। শনিবার (১৮ এপ্রিল ২০২৬) প্রকাশিত এই ভিডিওতে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্টে মঞ্জু দোষী প্রমাণিত হলেও শাস্তি তার কাছে খুব সামান্য মনে হয়েছে। আমি আরও বড় শাস্তি আশা করেছিলাম।

জাহানারা ভিডিওবার্তায় বলেন, ‘শুধু ক্রিকেট অঙ্গনের কথা বিবেচনা করলে আমার মত হাজারো জাহানারা পৃথিবীর অসংখ্য দলে আছে। আমি জাহানারা মঞ্জুর হাত থেকে ছাড় পাইনি। অই জাহানারারাও এই মঞ্জুর হাত থেকে ছাড় পাবে বলে আমি মনে করি না। ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত মিস্টার তৌহিদ মাহমুদ এবং মিস্টার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু এই দুইজনের কুপ্রস্তাবে আমি রাজি হই নাই দেখে, এই দুজনসহ এবং তাদের একটি সহযোগী গ্রুপ, চার বছর ধরে আমাকে চরম লেভেলের মেন্টাল টর্চার, মেন্টাল অ্যাবিউস করেছে, সব সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে এবং আমাকে চরম লেভেলের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মিস্টার তৌহিদ তো মারা গেছে, মিস্টার মঞ্জুর সামান্য শাস্তি হয়েছে। তবে তাদের সহযোগী গ্রুপের কোনো বিচারও হয়নি শাস্তিও হয়নি।’

ভিডিওতে জাহানারা সাবেক ক্রিকেটার ও বিসিবির সাবেক পরিচালক আবদুর রাজ্জাকর মন্তব্যেরও তীব্র সমালোচনা করেন। রাজ্জাক নাকি তদন্তের আগেই তার অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং পরে শাস্তিকে ‘অতিরিক্ত’ বলে মন্তব্য করেন। রাজ্জাককে নিয়ে জাহানারা বলেন, ‘আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে নারী উইংয়ের অভিভাবক তখনকার চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক ভাই, কোনো যাচাইবাছাই না করে মন্তব্য করে বসলেন, আমি নাকি বাইরের লোক। আমি যা বলেছি সব ভিত্তিহীন। রাজ্জাক ভাইয়ের জানা উচিত ছিল, আমি দল থেকে বাদও পড়িনি, আমি অবসরও নেইনি। আমি মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে ছুটিতে আছি। নিজের মাতৃভূমি থেকে নিজের প্রিয় ক্রিকেট থেকে অনেক দূরে আছি। এই আবদুর রাজ্জাক ভাই, সহ-সভাপতি ছিলেন নারী উইংয়ের, তিনি মন্তব্য করেন তার ভাই মঞ্জুর নাকি অনেক বড় শাস্তি দেওয়া হয়ে গিয়েছে। মঞ্জু নাকি এত বড় শাস্তি ডিজার্ভ করে না।’ 

‘নারী ক্রিকেটাররা নাকি সমঝোতা করে ক্রিকেট খেলেন। আমার প্রশ্ন, রাজ্জাক ভাই, আপনি একটা মায়ের সন্তান, আপনার স্ত্রী একজন নারী। আপনার মেয়ে আছে কিনা আমি জানি না। আপনার অবশ্যই বোনরা আছে। আজকে যদি আপনার বোন, মেয়ে, স্ত্রীরা ক্রিকেট খেলত, আপনি কি এই নোংরা মন্তব্য করতেন? আমার মানতে কষ্ট হয় আপনি একজন ক্রিকেটার ছিলেন, বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, আপনি একজন নারীর সন্তান। আমরা শুধু নারী ক্রিকেটাররা না, এমন অনেক সাপোর্ট স্টাফ আছেন, কুপ্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কারণে অনেককে বছরের পর বছর ধরে সাইড অফ করে দেওয়া হয়েছে।’


বিজ্ঞাপন


ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের কাছে জাহানারার তিন অনুরোধ- 

মঞ্জুরুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের কঠোর বিচার: জাহানারা বলেন, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মঞ্জুরুল ইসলাম, প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদ ও তাদের একটি গ্রুপ তাকে চরম মানসিক নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। মঞ্জুর শাস্তি হলেও সহযোগীদের কোনো বিচার হয়নি। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। 

‘ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ভাইয়াআমার প্রথম অনুরোধ আপনার কাছে—মঞ্জু এবং তৌহিদের এই সহযোগী গ্রুপের বিচার চাই আমি, কঠিন থেকে কঠিন বিচার চাই। দয়া করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এদের বিচারের ব্যবস্থা করুন প্লিজ। আমার মতো যেন আর কোনও জাহানারা সাফারার না হয় ভবিষ্যতে।’

অন্যান্য নারী ক্রিকেটারদের অভিযোগের তদন্ত: জাহানারা উল্লেখ করেন, তার কথা বলার সাহস দেখে অনেক নারী ক্রিকেটার ও অন্যান্য ইভেন্টের খেলোয়াড়রা তাদের অভিযোগ মিডিয়ায় তুলে ধরেছেন। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হলে ভুক্তভোগীরা আর কখনো ফিরে আসতে পারবেন না। তিনি সিইও নিজামউদ্দীন চৌধুরী সুজনের সহায়তার কথাও স্মরণ করেন, যদিও ২০২১ সালে অভিযোগ জানানোর পর তাকে পরের টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়।

‘আমি কথা বলেছি দেখে সাহস পেয়ে আমার যে বোনরা মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের অভিযোগগুলি তুলে ধরেছে—শুধুমাত্র ক্রিকেটের না, আমার ক্রিকেটের বোনরা, আমার শুটারের বোনরা, আমার অন্যান্য ইভেন্টের যে যে বোনরা তাদের অভিযোগগুলি মিডিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরেছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সকলের বিচারের ব্যবস্থা করুন প্লিজ। আজ যদি আপনি এর বিচার না করেন তাহলে আমার এই বোনরা তাদের স্ব স্ব ডিপার্টমেন্টে কোনোদিনও ব্যাক করতে পারবে না। তার সবথেকে বড় প্রমাণ দুই-তিন বছর আগে আন্ডার এইটিনের একজন ক্রিকেটার আমার এক বোন, সে সেক্সুয়াল হ্যারাজ হওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে কমপ্লেইন করে।’ 

‘সিইও সুজন স্যার তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নির্ধারণ করেন এবং ওমেন্স উইংয়ের একজন কর্মকর্তা গিল্টি ফাউন্ড হয়। কিন্তু, আমার ওই বোন আজ পর্যন্ত ক্রিকেটে কামব্যাক করতে পারে নাই। ডোমেস্টিকেও কোনও ম্যাচ খেলতে পারেনি, কোথাও কোনও প্র্যাকটিস করতেও পারেনি। তার সবথেকে বড় অপরাধ সে কেন কমপ্লেইন করেছে, সে কেন সমঝোতা করে নাই। আজকে যদি আমাদের সবথেকে বড় অপরাধ এটাই হয়, আমরা সমঝোতা করি নাই, আমরা একটা সুন্দর পরিবেশ চাই, একটা সেফ পরিবেশ চাই। নির্ভয়ে মেধার বিকাশ ঘটিয়ে আমরা খেলতে পারি, এটাই কি আমাদের অপরাধ?’

ক্রীড়াঙ্গনে নারী ও শিশুদের জন্য সেফগার্ডিং পলিসি: জাহানারা প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন, ক্রীড়াঙ্গনে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তায় একটি শক্তিশালী সেফগার্ডিং নীতি চালু করতে। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো দেশের মতো যেন কোনো ধরনের অস্বস্তিকর স্পর্শ বা প্রস্তাবের আগে অনুমতি নিতে হয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে আর্থিক জরিমানাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। এতে করে ক্ষমতাবানরা অসহায় নারীদের ওপর অপব্যবহার করতে সাহস পাবে না বলে তিনি মনে করেন।

তিনি লেখেন, ‘আমার তৃতীয় অনুরোধ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে। রিসেন্টলি আপনি যে ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি মহানুভবতা দেখিয়েছেন তা আমাকে সাহস যুগিয়েছি আপনার কাছে অনুরোধ নিয়ে আসার। প্রধানমন্ত্রী এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য একটা স্ট্রং সেফেস্ট সেফগার্ডিং পলিসির ব্যবস্থা করে দিন যত দ্রুত সম্ভব। তাহলে আর এই নোংরা মানুষগুলো তাদের মুখ থেকে কুপ্রস্তাব দেওয়া তো দূরে থাক, চোখ তুলে মেয়েদের প্রতি তাকানোরও সাহস পাবে না।’

এসটি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর