বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

বিসিবির হট সিট যেন মিউজিক্যাল চেয়ার

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

বিসিবির হট সিট যেন মিউজিক্যাল চেয়ার

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতির চেয়ারটি যেন এক অভিশপ্ত সিংহাসন। যে বসে, সে-ই একসময় পড়ে যায়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাত্র দেড় বছরেরও বেশি সময়ে তিনজন সভাপতি এসেছেন, প্রত্যেকের আগমন প্রশ্নবিদ্ধ, বিদায় বেদনাদায়ক। নাজমুল হাসান পাপনের দীর্ঘ রাজত্ব শেষ হলো সরকার পতনের সঙ্গে। ফারুক আহমেদের আশার আলো নিভে গেল মাত্র নয় মাসে। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ‘টেস্ট ইনিংস’ও থেমে গেল বাউন্সারের আঘাতে। আর এখন মঞ্চে তামিম ইকবাল ৩৭ বছরের তরুণ অধিনায়ক, বিসিবির ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী সভাপতি। কিন্তু চেয়ারের মোহ কি তাঁকেও একদিন গ্রাস করবে?

এই অব্যাহত পরিবর্তন দেশের ক্রিকেটকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। খেলোয়াড় তৈরি, ঘরোয়া লিগ চালানো, আন্তর্জাতিক সিরিজ আয়োজন; সবকিছুতেই তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। গত প্রায় দেড় বছরে বিসিবি দেখেছে একাধিক নেতৃত্বের আসা-যাওয়া, যা ক্রিকেট ভক্তদের মনে প্রশ্ন তুলছে, কবে থামবে এই অস্থিরতা?


বিজ্ঞাপন


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দীর্ঘদিনের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন দেশ ছাড়েন। তারপর থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ২১ আগস্ট ২০২৪-এ সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদের নেতৃত্বে অস্থায়ী বোর্ড দায়িত্ব নেয়। অনেকেই তখন আশা করেছিলেন, এবার হয়তো স্থিতিশীলতা ফিরবে। কিন্তু সেই আশা বেশিদিন টেকেনি।

২০২৫ সালের মে মাসে ফারুক আহমেদের বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল। পরে অক্টোবর ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তামিম ইকবাল প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় বুলবুল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হন। তবে শুরু থেকেই এই নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ উঠতে থাকে। তামিমসহ অনেকে এটিকে চ্যালেঞ্জ করেন। ফলে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের আসরও নির্ধারিত সময়ে শুরু করা যায়নি।

সবশেষ বড় পরিবর্তন আসে ৭ এপ্রিল ২০২৬। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন পুরো বোর্ড ভেঙে দেয়। পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুসারে নির্বাচনী অনিয়ম ও অন্যান্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গঠন করা হয় ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি। এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি হয়ে গেলেন বিসিবির ইতিহাসে সবচেয়ে তরুণ সভাপতি।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং বর্তমান অস্থিতিশীলতা কাটাতে বুলবুল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। বুলবুল জানিয়ে দিয়েছেন, উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত কোনো রায় না আসা পর্যন্ত তিনিই বিসিবির বৈধ সভাপতি হিসেবে বহাল আছেন। তবে আইসিসি সূত্রগুলো বলছে, এ আবেদন খুব একটা গুরুত্ব পাবে না। কারণ তার অবস্থানে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে।


বিজ্ঞাপন


টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় বুলবুল আইসিসিকে জানিয়েছিলেন যে সরকারি নির্দেশনার কারণে দল ভারতে যেতে পারেনি। এখন একই সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আইসিসির সুরক্ষা চাইছেন। আইসিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতীয় গণমাধ্যমে বলেন, ‘এটি সত্যিই আশ্চর্যজনক। এই সেই একই বোর্ড সভাপতি যিনি কিছুদিন আগে আইসিসির সঙ্গে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সরকারের দোহাই দিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেননি। আর এখন নিজের পদের বেলায় তিনি সরকারি হস্তক্ষেপের দোহাই দিয়ে আইসিসির সুরক্ষা চাইছেন, এটা খুবই অবাক করার মতো।’

বৈশ্বিক নিয়ম অনুসারে সরকারি হস্তক্ষেপ আইসিসি পছন্দ করে না। ২০০১ সালে ফিফা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে নিষিদ্ধ করেছিল, ২০২৩ সালে আইসিসি শ্রীলঙ্কাকে। এবার কি বিসিবির পালা? সম্ভাবনা কম বলেই মনে হয়, কারণ আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহর সমর্থন ছাড়া এমন ঝুঁকি নেওয়া কঠিন।

তামিম দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের বর্তমান নিম্নমুখী অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশের ক্রিকেটের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনাই তার লক্ষ্য। তিনি আইসিসি ও এসিসির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপরও জোর দিয়েছেন। এরই মধ্যে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) থেকেও তাকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

তবে ঘনঘন বোর্ড পরিবর্তন ক্রিকেটের জন্য ক্ষতিকর। একটি বোর্ডকে অন্তত নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত স্থিতিশীল রাখা না গেলে দল গঠন, অ্যাকাডেমি পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত কোন্দল যেন ক্রিকেটের স্বার্থকে ছাপিয়ে না যায়।

এসটি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর