নারী এশিয়ান কাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই চমক জাগানিয়া পারফর্ম করেছিল বাংলাদেশ। শক্তিশালী চীনের নিপক্ষে ২-০ গোলে হারলেও লড়েছে বীরের মত। লাল-সবুজের দল আজ নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নেমেছিল উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে। তবে প্রথম ম্যাচের উড়ন্ত ফর্ম আর এবার ধরে রাখতে পারেননি ঋতুপর্ণা চাকমারা। গ্রুপ ‘বি’–এর দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী ডিপিআর কোরিয়ার কাছে ৫–০ গোলে পরাজিত হয়েছে পিটার বাটলারের দল।
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট কোরিয়ার বিপক্ষে শুরু থেকেই কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। ১১২ নম্বরে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে কোরিয়ার র্যাঙ্কিং ব্যবধান ১০৩ ধাপ যা পুরো ম্যাচেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বল দখল, আক্রমণ ও সুযোগ- সব ক্ষেত্রেই আধিপত্য দেখায় কোরিয়ানরা।
বিজ্ঞাপন
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশকে নিজেদের অর্ধে ঠেলে দেয় কোরিয়া। ফলে গোলরক্ষক মিলি আক্তারই হয়ে ওঠেন মাঠের সবচেয়ে ব্যস্ত খেলোয়াড়। ম্যাচের অষ্টম মিনিটেই কোরিয়ার গোলের মুখে বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি। দারুণ এক সেভ করে দলকে রক্ষা করেন, যদিও ওই মুহূর্তে তাকে সামান্য চিকিৎসাও নিতে হয়। এরপরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকান এই গোলরক্ষক।
প্রথমার্ধে দুটি গোল বাতিল হওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। ১৪তম মিনিটে ডান দিক দিয়ে দারুণ আক্রমণ থেকে কিম কিয়ং ইয়ং বল জালে পাঠালেও ভিএআর যাচাইয়ে সেটি বাতিল হয়। আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় মিডফিল্ডার মিয়ং ইউ জংয়ের হ্যান্ডবলের কারণে গোলটি গণ্য হয়নি। ২৬তম মিনিটেও আরেকটি বিতর্কিত মুহূর্ত তৈরি হয়। কর্নার থেকে মিয়ং ইউ জংয়ের হেড গোললাইন থেকে ঠেকান মিলে। ফিরতি বলে হান জিন হং বল জালে পাঠালেও বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা হ্যান্ডবলের অভিযোগ তোলেন। ভিএআর যাচাই শেষে সেই গোলটিও বাতিল করা হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে গোল পায় কোরিয়া। ৪৫ মিনিটের পর যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে ডি-বক্সের ভেতর হং সং অককে ফাউল করেন বাংলাদেশের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার। পেনাল্টি থেকে গোল করে কোরিয়াকে এগিয়ে দেন মিয়ং ইউ জং। এরপর যেন দুঃস্বপ্ন নেমে আসে বাংলাদেশের জন্য। এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ডি-বক্সে জায়গা পেয়ে নিখুঁত শটে গোল করেন কিম কিয়ং ইয়ং। বিরতিতে যাওয়ার আগেই ব্যবধান দাঁড়ায় ২–০।
দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করে বাংলাদেশ। মনিকা চাকমা, স্বপ্না রানী ও মারিয়া মান্দা মাঝেমধ্যে সামনে এগোনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কোরিয়ার ধারাবাহিক আক্রমণের সামনে সেগুলো খুব বেশি কার্যকর হয়নি। ৬২তম মিনিটে আসে তৃতীয় গোল। থ্রু বল সামলাতে এগিয়ে আসেন মিলে আক্তার, কিন্তু কোরিয়ান মিডফিল্ডার চতুরতার সঙ্গে বল তুলে দেন গোলকিপারের ওপর দিয়ে। ফাঁকা জালে দৌড়ে এসে বল জড়িয়ে দেন চে উন ইয়ং।
বিজ্ঞাপন
এর মাত্র দুই মিনিট পরই আবারও গোল করে কোরিয়া। ৬৪তম মিনিটে জোরালো শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন কিম কিয়ং ইয়ং, তাতে ব্যবধান হয় ৪–০। ততক্ষণে চার গোল হজম করলেও মিলে আক্তারই ছিলেন বাংলাদেশের সেরা খেলোয়াড়। একাধিক একান্ত সুযোগে সেভ করে তিনি বড় ব্যবধানে হার থেকে দলকে কিছুটা রক্ষা করেন। ম্যাচের শেষ মিনিটে পঞ্চম গোলটি পায় কোরিয়া। ডান দিক থেকে সং চুন সিমের ক্রসে দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে হেড করে বল জালে পাঠান কিম হাই ইয়ং।
পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট কোরিয়ার দাপট। তারা মোট ২৯টি শট নেয়, যার মধ্যে ১১টি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে পুরো ম্যাচে একটি শটও নিতে পারেনি বাংলাদেশ। কর্নারেও ৬–০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল কোরিয়ানরা। প্রথম ম্যাচে চীনের বিপক্ষে ২–০ গোলে হারলেও আক্রমণে কিছুটা সম্ভাবনার ঝলক দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু কোরিয়ার বিপক্ষে খুব কম সময়ই প্রতিপক্ষের বক্সে বল নিয়ে যেতে পেরেছে তারা। ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমাকে কড়া নজরবন্দি করে রাখে কোরিয়ার রক্ষণভাগ।
ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের শক্তির স্বীকৃতি দেন বাংলাদেশের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার। তিনি বলেন, “কোরিয়া খুব শক্তিশালী দল। আমাদের লক্ষ্য ছিল ভালো খেলা ও লড়াই করা, আমরা সেটাই করার চেষ্টা করেছি।” প্রথমার্ধের শেষদিকে দ্রুত দুটি গোল খাওয়াই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলেও স্বীকার করেন তিনি। সিডনির তীব্র গরমও খেলায় প্রভাব ফেলেছে বলে জানান বাংলাদেশ অধিনায়ক।
বাংলাদেশের জন্য এই হার এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতার বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে দিল। তবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান শিক্ষা হয়ে থাকবে তাদের জন্য।

