বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে অর্থ পাচার, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছে সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্ব। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বুয়েনস এইরেসের উপকণ্ঠে পিলার এলাকার একটি রহস্যময় বিলাসবহুল ভিলা।
সবকিছুর শুরু ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। সাবেক আর্জেন্টাইন তারকা ফুটবলার কার্লোস তেভেজ একটি টুইটে (বর্তমানে এক্স পোস্ট) ইঙ্গিত দেন যে, এএফএ-র কোষাধ্যক্ষ পাবলো তোভিগিনো প্রায়ই পিলারে যাতায়াত করেন। তেভেজের দাবি, সেখানে বস্তাভর্তি টাকা পুঁতে রাখা হয়েছে এবং প্রাচীন ও বিলাসবহুল গাড়ির বিশাল সংগ্রহ গড়ে তোলা হয়েছে। এই পোস্টটি তখন বিতর্ক সৃষ্টি করলেও পরবর্তীতে এটি তদন্তের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
তেভেজের পোস্টের কয়েক মাস পর প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল কোয়ালিসিওন সিভিকা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। দলের পিলার শাখার সভাপতি মাতিয়াস ইয়োফে জানান, তারা ভিলায় কাজ করা প্রায় ১০ জন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছেন। কর্মচারীদের বর্ণনায় উঠে আসে যে, এএফএ সভাপতি ক্লদিও ‘চিকি’ তাপিয়া এবং তোভিগিনো মালিকের মতো সেখানে চলাফেরা করতেন। সুইমিং পুল ব্যবহার করতেন, হেলিকপ্টারে আসতেন এবং কর্মচারীদের ফুটবল জার্সি উপহার দিতেন।
ইয়োফে আরও বলেন, ‘তারা যে বর্ণনা দিয়েছে, তাতে বলা যায় তারা (তাপিয়া ও তোভিগিনো) মালিকের মতোই সেখানে চলাফেরা করতেন, সুইমিং পুল এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতেন। সবাই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই সম্পত্তি এএফএ-র লোকজনের।’
কোয়ালিসিওন সিভিকা একটি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালে মা-ছেলে আনা লুসিয়া কন্তে ও লুসিয়ানো নিকোলাস পান্তানোর মালিকানাধীন একটি কোম্পানি এই সম্পত্তি কিনেছে। কিন্তু তাদের আর্থিক সামর্থ্য এত বড় সম্পত্তি কেনার মতো নয়। নথি অনুযায়ী, সম্পত্তিটি ১.৮ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয়েছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর প্রকৃত মূল্য অনেক বেশি। অভিযোগে এটিকে তাপিয়া ও তোভিগিনোর অর্থ পাচারের আড়াল বলে দাবি করা হয়।
গত ডিসেম্বরের শুরুতে পুলিশ এএফএ সদর দপ্তর ও এক ডজনের বেশি ক্লাবে অভিযান চালায়। এর তিন দিন পর পিলারের ওই ভিলায় অভিযান হয়। সেখানে মেলে হেলিপোর্ট, আস্তাবল, সুইমিং পুল এবং মোট ৫৪টি বিলাসবহুল ও সংগ্রহযোগ্য গাড়ি – যার মধ্যে ফেরারি ও পোরশে রয়েছে। অভিযানে একটি ব্যাগ পাওয়া যায় যার ওপর এএফএ-র লোগো এবং তোভিগিনোর নাম লেখা। এ ছাড়া ফুটবল-সম্পর্কিত বই ও সম্মাননা প্ল্যাকও মেলে।
বিজ্ঞাপন
আরেক মামলায় আর্জেন্টিনার কর সংস্থা অভিযোগ আনে যে, তাপিয়া, তোভিগিনো ও অন্য নেতারা ১৩ মিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে রেখেছেন। বিচার মন্ত্রণালয় ২০১৭ সাল থেকে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারের হিসাব ব্যাখ্যা চেয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ইন্সপেক্টর জেনারেলদের প্রধান ড্যানিয়েল ভিটোলো রয়টার্সকে বলেন, ‘যদি এএফএ সত্যিই সব কাগজপত্র ঠিকঠাক রাখে, তাহলে সহজেই ব্যাখ্যা করা যায় এমন বিষয়, ঠিকঠাকভাবে ব্যাখ্যা করছে না কেন?’
এএফএ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলাইয়ের সরকারের রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার। তারা ২০১৭ সালে তাপিয়া সভাপতি হওয়ার পর থেকে ২০২২ বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন শিরোপা জয়ের কথা তুলে ধরে বলেছে, ‘আমরা সঠিক পথে আছি।’
ক্রীড়া সাংবাদিক নেস্টর সেন্ট্রা বলেন, ‘এখানে দুটি এএফএ রয়েছে’ – একটি মাঠে সাফল্য দেখাচ্ছে, অন্যটি অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় ডুবে আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব মামলা ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করবে না, কারণ লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ বাধাগ্রস্ত করার রাজনৈতিক মূল্য কেউ দিতে চাইবে না।
বিশ্ব ফুটবলে দুর্নীতি নতুন নয়। ফিফা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে আগেও। কিন্তু আর্জেন্টিনার ভক্তদের মতে, এবার সবকিছু উন্মোচিত হয়েছে। যদিও তারা জানেন, এ ধরনের ঘটনা আর্জেন্টাইন ফুটবলে নতুন নয়।
সূত্র: রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া রিপোর্ট

