শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

৫০০ বছরের রেকর্ড ভাঙতে পারে এল নিনো, ২০২৭ নিয়ে ‘বড় সতর্কতা’

বিজ্ঞান ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৬ এএম

শেয়ার করুন:

‘৫০০ বছরের রেকর্ড’ ভাঙতে পারে এল নিনো, ২০২৭ নিয়ে বড় সতর্কতা
এল নিনোর প্রভাবে খরা ও রেকর্ডভাঙা গরমে পুড়তে পারে বিশ্ব।

প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দফতর মেট অফিসের পূর্বাভাস বলছে, এবারের এল নিনো ‘জীবিত মানুষের স্মৃতিতে’ সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মেট অফিসের বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সাল ২০২৪ সালকে ছাড়িয়ে গিয়ে রেকর্ডে বিশ্বের উষ্ণতম বছর হতে পারে।

শক্তিশালী এই প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতির প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম কমে যাওয়া।

যুক্তরাজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। মেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর কারণে শরৎ ও শীতের শুরুতে যুক্তরাজ্যসহ উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে বৃষ্টি ও ঝড়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কাইফ বলেন, ‘আমাদের পরিষ্কারভাবে বলা উচিত, এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। আমাদের পূর্বাভাসে এল নিনোর সংকেত এতটা তীব্র আমি কখনো দেখিনি।’

এল নিনো কী?

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেয় এবং প্রায় এক বছর স্থায়ী হতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে সাধারণত পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে গেলে বা কখনো দিক পরিবর্তন করলে সমুদ্রের উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমুদ্র থেকে বিপুল তাপ বায়ুমণ্ডলে চলে যায় এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে।

প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে সেটিকে এল নিনো হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

l_ninoবর্তমান পরিমাপ অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উষ্ণ। মেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় এই তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সাল থেকে সংরক্ষিত রেকর্ড অনুযায়ী এমন মাত্রার ঘটনা নজিরবিহীন হতে পারে। মেট অফিসের বিজ্ঞানীদের মতে, এটি সম্ভবত ১৯ শতকের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।

সমুদ্রের আরও গভীর অংশেও অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার গভীরতায় পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই অতিরিক্ত উষ্ণ পানি এল নিনোকে আরও শক্তিশালী করার জন্য বাড়তি তাপের উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্কলে আর্থের জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. জেক হাউসফাদার বলেন, ‘এল নিনো এখনো কয়েক মাস ধরে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে এটি রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঘটনা হতে পারে—এমন ধারণার প্রতি বিজ্ঞানীদের আস্থা বাড়ছে।

কিছু জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান মেট অফিসের পূর্বাভাসের চেয়েও শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা দেখছে। কোনো কোনো পূর্বাভাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।

এমনটা হলে এটি গত ৫০০, এমনকি ১ হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে-এমন সম্ভাবনার কথা বলেছেন হাউসফাদার। তবে এত দীর্ঘ সময়ের নির্ভরযোগ্য সরাসরি রেকর্ড না থাকায় বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

বিশ্বজুড়ে কী প্রভাব পড়তে পারে?

এল নিনোর কারণে সমুদ্রের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপের বণ্টন বদলে যায়। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বাতাসের গতিপথেও পরিবর্তন আসে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে প্রতিটি এল নিনো একই রকম নয়। ফলে এর প্রভাবও একেকবার একেক অঞ্চলে ভিন্ন হতে পারে।

এল নিনোর বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৬ সালেও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু এলাকায় মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম রয়েছে।

l_nino-2অন্যদিকে, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আটলান্টিকে বাতাসের পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম কমে যেতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি এল নিনোর প্রভাব আরও সরাসরি হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিপরীতে পেরু, ইকুয়েডর এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ায় কী প্রভাব পড়বে?

চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্যে দেখা দেওয়া রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের প্রধান কারণ এল নিনো নয়। তবে শরৎ ও শীতের শুরুতে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যেতে পারে। মেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বৃষ্টি ও ঝড়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

আবার শীতের শেষ দিকে এল নিনো ঠান্ডা আবহাওয়ার সম্ভাবনাও কিছুটা বাড়াতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে এল নিনো ও ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যকার সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

২০২৭ কি হতে যাচ্ছে উষ্ণতম বছর?

এল নিনোর সময় সমুদ্র থেকে বিপুল তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়ে। সাধারণত এল নিনোর সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরের ক্যালেন্ডার বছরে এই উষ্ণতার প্রভাব বেশি দেখা যায়।

এ কারণেই ২০২৭ সাল ২০২৪ সালকে ছাড়িয়ে গিয়ে রেকর্ডে বিশ্বের উষ্ণতম বছর হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি বলে মনে করছেন মেট অফিসের জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. নিক ডানস্টোন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ২০২৭ সালের উষ্ণতার জন্য এল নিনোই একমাত্র কারণ। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের ওপর এল নিনোর অতিরিক্ত উষ্ণতার প্রভাব যুক্ত হবে।

l_nino-3এর আগে চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) সতর্ক করেছে, এল নিনোর প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কয়েক কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার গুরুতর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, শক্তিশালী এই এল নিনো শুধু তাপমাত্রা বাড়ানোর ঝুঁকিই তৈরি করছে না বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, ঝড় এবং কৃষি উৎপাদনের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: বিবিসি।

এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর