কখনো কি ভেবে দেখেছেন, হাতের নাগালে থাকা একটি ছোট লোহার টুকরা পানিতে ফেললে তা সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায়, কিন্তু হাজার হাজার টন ওজনের বিশাল আকৃতির জাহাজ অনায়াসেই সাগরে ভেসে থাকে? আপাতদৃষ্টিতে একে জাদু মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের এক চমৎকার কৌশল। আজ থেকে প্রায় ২২০০ বছর আগে গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের আবিষ্কৃত একটি বিশেষ নীতি বা সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই বিশাল জাহাজগুলো পানিতে ভেসে থাকে।
আর্কিমিডিসের নীতি ও পানির রহস্য
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের সূত্র অনুযায়ী, কোনো বস্তু যখন পানিতে ডোবানো হয়, তখন সেই বস্তুটির ওপর পানি একটি ঊর্ধ্বমুখী চাপ প্রয়োগ করে। এই চাপকে বলা হয় ‘প্লবতা’ বা ‘উচ্ছ্বাস বল’। কোনো বস্তু যতটুকু পরিমাণ পানি সরিয়ে দেয় (স্থানচ্যুত করে), সেই পানির ওজন যদি বস্তুটির ওজনের সমান বা বেশি হয়, তবেই বস্তুটি ভেসে থাকবে। একটি ছোট লোহার টুকরার ওজন তার সরিয়ে দেওয়া পানির ওজনের চেয়ে বেশি, তাই সেটি ডুবে যায়।

জাহাজের বিশাল আকার ও ফাঁপা নকশা
একটি জাহাজ লোহা বা ইস্পাতের তৈরি হলেও এর ভেতরের বিশাল অংশ ফাঁপা থাকে। জাহাজের তলার অংশ (হাল) অনেক বড় এবং চওড়া করা হয় যাতে এটি প্রচুর পরিমাণে পানি সরিয়ে দিতে পারে। জাহাজের ভেতরে বাতাস এবং ফাঁকা জায়গা বেশি থাকায় এর গড় ঘনত্ব পানির ঘনত্বের চেয়ে কম হয়। ফলে জাহাজটি যতটুকু পানি সরিয়ে দেয়, তার ওজন জাহাজের মোট ওজনের চেয়ে বেশি হয়। এই বিপুল পরিমাণ পানির ঊর্ধ্বমুখী ধাক্কা বা প্লবতাই হাজার হাজার টনের জাহাজকে পানিতে ভাসিয়ে রাখে।
বিজ্ঞাপন
ঘনত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন
জাহাজ ভাসার মূল কারণ হলো ঘনত্ব। পানির ঘনত্ব যেখানে ১ গ্রাম/সেমি³, জাহাজের নকশা এমনভাবে করা হয় যেন এর গড় ঘনত্ব এর চেয়ে কম থাকে। বর্তমান সময়ে আধুনিক কম্পিউটার ক্যালকুলেশনের মাধ্যমে জাহাজের হালের নকশা নিখুঁত করা হয়। এছাড়া জাহাজে ‘প্লিমসোল লাইন’ বা বিশেষ রেখা ব্যবহার করা হয়, যা নির্দেশ করে একটি জাহাজ ঠিক কতটুকু পণ্য বা বোঝা বহন করতে পারবে।
আরও পড়ুন: টিভির রিমোটে বিভিন্ন রঙের বাটন থাকে কেন?
ভারসাম্য রক্ষায় ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক
সমুদ্রে ঝড় বা ঢেউয়ের মধ্যে জাহাজের ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যবহার করা হয় ‘ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক’। এই ট্যাঙ্কে প্রয়োজনমতো পানি ভরে বা বের করে দিয়ে জাহাজের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়। সুতরাং, একটি জাহাজ স্রেফ পানির ওপর ভেসে থাকে না, বরং আর্কিমিডিসের প্রাচীন নীতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয়ে এটি সম্ভব হয়।
এজেড

