২০২৫ সালের এপ্রিলে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে একটি অদ্ভুত দাবি করা হয় যে—উত্তর ইতালির ডলোমাইটস পর্বতমালার একটি নরওয়ে স্প্রুস (Picea abies) বনের গাছগুলো ২০২২ সালের অক্টোবরে একটি আংশিক সূর্যগ্রহণের কয়েক ঘণ্টা আগে তাদের কোষীয় স্তরের বৈদ্যুতিক সংকেত বা 'ইলেক্ট্রোম' (electromes) দ্রুত সিনক্রোনাইজ বা সমন্বয় করতে শুরু করেছিল।
যদি এটি সত্য হতো, তবে ইতালীয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এই আবিষ্কারটি উদ্ভিদরা কীভাবে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে তা বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে গণ্য হতো।
সমালোচকদের প্রবল সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও, "কথা বলা গাছের বন" শিরোনামে খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখন একদল বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন যে, ডলোমাইট পাহাড়ের সেই রহস্যময় ঘটনার অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তাদের কাছে আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, স্প্রুস গাছগুলো মূলত সাম্প্রতিক এক বজ্রঝড়ের কারণে বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত ছিল। 'ট্রেন্ডস ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স' (Trends in Plant Science) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই প্রমাণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় বাস্তুসংস্থানবিদ এবং এই গবেষণার সহ-লেখক এরিয়েল নভোপ্লানস্কি একটি বিবৃতিতে সরাসরি বলেছেন, “আমার কাছে (২০২৫ সালের এপ্রিলের) সেই গবেষণাপত্রটি জৈবিক গবেষণার মূল কেন্দ্রে ছদ্মবিজ্ঞানের (pseudoscience) অনুপ্রবেশের প্রতিফলন। ভারী বৃষ্টিপাত এবং কাছাকাছি বজ্রপাতের মতো সাধারণ পরিবেশগত কারণগুলো বিবেচনা করার পরিবর্তে, লেখকরা একটি মুখরোচক ধারণার দিকে ঝুঁকেছেন যে গাছগুলো সূর্যগ্রহণের পূর্বাভাস দিচ্ছিল।”
এমন নয় যে গাছপালা পরিবেশের পরিবর্তনে সাড়া দেয় না—তারা অবশ্যই দেয়। তারা আলোর পরিবর্তন এবং মাটির নিচের লবণাক্ততা বা পুষ্টির অভাব বুঝতে পারে। কিন্তু এই বিষয়গুলো সরাসরি অস্তিত্ব রক্ষার সাথে জড়িত এবং এর স্পষ্ট পূর্বাভাস বা ইঙ্গিত থাকে। নভোপ্লানস্কি এবং তার সহ-লেখকরা লিখেছেন, “আলোর মাত্রা এবং বর্ণালীর সামান্য পরিবর্তনেও গাছপালা প্রতিবেশীদের ছায়ায় পড়ার অনেক আগেই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতার আভাস পেতে পারে।”
তারা প্রায়ই প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তথ্য গ্রহণ করে এটি করে থাকে। তবে, একটি আংশিক সূর্যগ্রহণ এই মানদণ্ডের মধ্যে পড়ে না। নভোপ্লানস্কি ব্যাখ্যা করেছেন, “সেই সূর্যগ্রহণ মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য আলোর পরিমাণ প্রায় ১০.৫ শতাংশ কমিয়েছিল, কিন্তু সেই সময়েও সূর্যের আলোর যে স্তর ছিল তা গাছগুলোর ব্যবহারের ক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। অথচ ওই এলাকায় মেঘের কারণে আলোর পরিমাণ ও গুণগত মান এর চেয়ে অনেক বেশি হ্রাস-বৃদ্ধি পায়।”

এই দাবিটি খণ্ডন করে গবেষক দলটি আরও বলেছেন যে, যদি আলোর অভাব গাছগুলোর মধ্যে প্রস্তুতির প্রতিক্রিয়া তৈরির জন্য যথেষ্ট হতোও, তবুও তাদের পক্ষে এটি আগে থেকে বোঝার কোনো উপায় ছিল না। ২০২২ সালের সেই সূর্যগ্রহণটি একটি বিশেষ চক্রের অংশ ছিল যা প্রতি ১৮ বছর ১১ দিন ৮ ঘণ্টা অন্তর ঘটে। আগের গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল যে, ডলোমাইটের বড় গাছগুলো ছোট গাছগুলোকে সতর্ক করার জন্য বেশি বৈদ্যুতিক তৎপরতা দেখাচ্ছিল। কিন্তু প্রতিটি সূর্যগ্রহণের পথ, স্থায়িত্ব এবং মাত্রা ভিন্ন হয়। তাই বড় গাছগুলো যদি আগের কোনো গ্রহণ ‘মনেও রাখে’, তবুও পরেরটির জন্য তারা নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা করতে পারত না।
আরও পড়ুন: ব্যাঙের বিষ কি সাপের মতো প্রাণঘাতী? জানুন বিষাক্ত ব্যাঙ চেনার উপায়
এছাড়া মহাকর্ষীয় পরিবর্তনের যে বিষয়টি বলা হয়েছিল, তার প্রভাব একটি অমাবস্যার সময়ের চেয়ে বেশি ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা হলো গবেষণার নমুনা সংখ্যা। প্রথম গবেষণার লেখক মাত্র তিনটি জীবন্ত গাছ এবং পাঁচটি মৃত গুঁড়ির ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, যা নির্ভরযোগ্য ফলাফল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
নভোপ্লানস্কি বলেন, “গাছের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ একটি বাস্তব ঘটনা, কিন্তু এটি এখনো গবেষণার প্রাথমিক স্তরে আছে। কোনো অবৈজ্ঞানিক বা কাল্পনিক দাবি ছাড়াই বন নিজস্ব মহিমায় যথেষ্ট বিস্ময়কর।”
তথ্যসূত্র: পপুলার সায়েন্স
এজেড




