মানবদেহের রহস্যময় জেনেটিক কোড বা ডিএনএ-র ৯৮ শতাংশই এতদিন বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল অনেকটা ‘অন্ধকার অঞ্চলের’ মতো। দীর্ঘকাল ধরে এই অংশটিকে ‘জাঙ্ক ডিএনএ’ বা অপ্রয়োজনীয় ভাবা হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান বলছে এখানেই লুকিয়ে আছে ক্যানসার ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগের মূল চাবিকাঠি। এবার সেই রহস্যভেদে গুগল ডিপমাইন্ড নিয়ে এলো পরবর্তী প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মডেল ‘আলফাজেনোম’ (AlphaGenome)।
গত ২৮ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হওয়া এই এআই মডেলটি ডিএনএ-র নন-কোডিং অংশ বিশ্লেষণ করে মানুষের জীবন ও রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া ডিকোড করতে সক্ষম। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি একটি বড় বিপ্লব আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
‘জাঙ্ক ডিএনএ’ এখন গবেষণার মূল কেন্দ্র
২০০৩ সালে মানব জিনোম মানচিত্র তৈরির পর দেখা যায়, আমাদের ডিএনএ-র মাত্র ২ শতাংশ প্রোটিন তৈরির কাজ করে। বাকি ৯৮ শতাংশ অংশটি আসলে জিনের ‘সুইচ’ হিসেবে কাজ করে—অর্থাৎ কোন জিন কখন এবং কতটা সক্রিয় হবে, তা নির্ধারণ করে এই নন-কোডিং অংশ। এই অংশে সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেই ক্যান্সার, হৃদরোগ বা স্নায়বিক ব্যাধির মতো রোগ বাসা বাঁধে। আলফাজেনোম মূলত এই নিয়ন্ত্রক অংশ বা জিনের ‘ব্যাকরণ’ বোঝার কাজ করছে।

১০ লক্ষ অক্ষর বিশ্লেষণের ক্ষমতা
বিজ্ঞাপন
আলফাজেনোমের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো এর বিশাল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা। আগের এআই মডেলগুলো ডিএনএ-র ছোট ছোট অংশ বিশ্লেষণ করতে পারলেও, আলফাজেনোম এক দফায় ১০ লক্ষ অক্ষর পর্যন্ত দীর্ঘ ডিএনএ সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করতে পারে। গুগল ডিপমাইন্ডের গবেষকদের মতে, জিনের নিয়ন্ত্রণকারী উপাদানগুলো ডিএনএ-র অনেক দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করতে পারে, যা শনাক্ত করতে এই দীর্ঘ সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ অপরিহার্য ছিল।
বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত দুয়ার
গুগল জানিয়েছে, আলফাজেনোম ইতিমধ্যে বিশ্বের ১৬০টি দেশের ৩ হাজারেরও বেশি বিজ্ঞানী পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করছেন। অ-বাণিজ্যিক বা গবেষণার উদ্দেশ্যে এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এটি ব্যবহারের ফলে জেনেটিক গবেষণার সময় এবং খরচ অনেকাংশেই কমে আসবে। ফলে ভবিষ্যতে প্রতিটি মানুষের জন্য তার ডিএনএ অনুযায়ী আলাদা ও নিখুঁত চিকিৎসা পদ্ধতি বা ‘প্রিসিশন মেডিসিন’ উদ্ভাবন সহজ হবে।
আরও পড়ুন: ৬৭ হাজার বছর পুরনো ‘অদৃশ্য’ গুহাচিত্রের সন্ধান
সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
তবে সফলতার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এই এআই-এর নির্ভুলতা মূলত প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত তথ্যের গুণের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া পরিবেশগত কারণে জিনের পরিবর্তনগুলো এআই সবসময় সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। তবুও, জীববিজ্ঞানের সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সমন্বয়কে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এজেড

