সোমবার, ১৭ জুন, ২০২৪, ঢাকা

জুমার দিনের মাসনুন আমল ও ফজিলত

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ মে ২০২৩, ১২:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

জুমার দিনের মাসনুন আমল ও ফজিলত

জুমাবার মুসলমানদের কাছে একটি কাঙ্ক্ষিত দিন। এই দিনকে সাপ্তাহিক ঈদ বলা হয়েছে হাদিসে। সৃষ্টিজগতের শুরু থেকে দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। মানব ইতিহাসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে এই দিন। জুমা নামে পবিত্র কোরআনে একটি স্বতন্ত্র সুরা আছে। সপ্তাহের বাকি ছয় দিনের তুলনায় অধিক মর্যাদাসম্পন্ন দিনটির আমলও অনেক ফজিলতপূর্ণ।

জুমার ১২টি মাসনুন আমল 
হাদিসের বিশাল ভাণ্ডার থেকে পয়েন্ট আকারে জুমার দিনের ১২টি মাসনুন আমল এখানে তুলে ধরা হলো।


বিজ্ঞাপন


১) গোসল করা

২) ফজরের ফরজ নামাজে সুরারা সাজদা ও দাহর/ইনসান তেলাওয়াত করা।

৩) উত্তম পোশাক পরা

৪) সুগন্ধি ব্যবহার করা


বিজ্ঞাপন


৫) আগেভাগে মসজিদে যাওয়া

৬) সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা। (বৃহস্পতিবার সূর্যাস্ত থেকে শুক্রবার সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময়ে)

৭) মসজিদে প্রবেশ করে কমপক্ষে দুই রাকাত দুখুলুল মসজিদ আদায় করা (তবে এটি শুধু জুমআর জন্য নির্দিষ্ট নয়)

৮) ইমামের কাছাকাছি গিয়ে বসা

৯) মনযোগ দিয়ে খুতবা শোনা এবং খুতবা চলাকালে কোনো কথা না বলা

১০) দুই খুতবার মাঝখানে বেশি বেশি দোয়া করা

১১) অন্য সময়েও দোয়া করা (কারণ এদিন দোয়া কবুল হয়)

১২) সারাদিন যত বেশি সম্ভব নবীজির ওপর দরূদ পড়া

জুমাবারের আমলগুলোর ফজিলত
আওস ইবনে আওস আস-সাক্বাফী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বলতে শুনেছি—‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করবে এবং গোসল করাবে, প্রত্যুষে ঘুম থেকে জাগবে এবং জাগাবে, আগে-আগে (মসজিদে যাওয়ার জন্য) প্রস্তুত হবে, বাহনে চড়ে নয় বরং পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে এবং কোনরূপ অনর্থক কথা না বলে ইমামের কাছাকাছি বসে খুতবা শুনবে, তার (মাসজিদে যাওয়ার) প্রতিটি পদক্ষেপ সুন্নত হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে সে এক বছর যাবৎ সিয়াম পালন ও রাতভর সলাত আদায়ের (সমান) সওয়াব পাবে। (আবু দাউদ: ৩৪৫, মান-সহিহ)

উল্লেখিত হাদিস অনুযায়ী, কারো বাসা থেকে মসজিদের দূরত্ব যদি ১০০ কদম হয়, তাহলে এই পাঁচটা কাজ করলে সে ব্যক্তি ১০০ বছর নফল রোজা ও ১০০ বছর নফল সালাতের সওয়াব পেয়ে যাবে। সুবহানাল্লাহ!

জুমার দিন সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করলে কেয়ামতের দিন তা আলো দিবে এবং দুই জুমার মাঝের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—‘যে ব্যক্তি শুক্রবার সুরা কাহাফ পাঠ করবে, তার পা থেকে আকাশের উচ্চতা পর্যন্ত নুর (আলো) হয়ে যাবে, যা কেয়ামতের দিন আলো দিবে এবং বিগত জুমা থেকে এই জুমা পর্যন্ত তার সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।’ (আত তারগিব ওয়া তারহিব: ১/২৯৮)

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে, তার জন্যে এক জুমা থেকে আরেক জুমা পর্যন্ত আলোকোজ্জ্বল হবে।’ (মুসতাদারেক হাকেম: ২/৩৯৯, বায়হাকি: ৩/২৪৯। আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সুরা কাহফের প্রথম দিক থেকে ১০টি আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের (ফেতনা) থেকে পরিত্রাণ পাবে।’ (সহিহ মুসলিম)। তবে, আলেমদের মতে, এটি যেকোনো সময়ের জন্য প্রযোজ্য। শুধু জুমার দিনের জন্যে নির্দিষ্ট নয়।

রাসুলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে, উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে এবং আল্লাহ তার পরিবারের জন্য যে সুগন্ধির ব্যবস্থা করেছেন, তা শরীরে লাগায়, এরপর জুমার সালাতে এসে অনর্থক আচরণ না করে এবং দুজনের মাঝে ফাঁক করে অগ্রসর না হয়, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহমসূহ ক্ষমা করা হয়। (ইবনে মাজাহ: ১০৯৭)

জুমার দিনের বিশেষত্ব নিয়ে অনেক হাদিস রয়েছে। এক হাদিসে নবীজি জানিয়েছেন, ‘জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতাগণ অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে আগে  আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার আগে আসে, সে ওই ব্যক্তির মতো, যে একটি মোটাতাজা উট কুরবানি করে। এরপরে যে আসে, সে ওই ব্যক্তির মতো, যে একটি গাভী কুরবানি করে। এরপরে  আগমনকারী ব্যক্তি মুরগী দানকারীর মতো। তারপরের আগমনকারী একটি ডিম দানকারীর মতো। অতঃপর ইমাম যখন বের হন, তখন ফেরেশতাগণ তাঁদের খাতা বন্ধ করে দিয়ে মনোযোগ সহকারে খুত্‌বা শ্রবণ করতে থাকেন।’ (বুখারি: ৯২৯)

দোয়া কবুলের বিশেষ সময়
জুমার দিন একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে, যখন বান্দার সকল চাওয়া আল্লাহ পূরণ করেন। সময়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কোনো আলেমের মতে, সময়টি হচ্ছে দুই খুতবার মাঝের সময়। আর কোনো আলেম বলেন, আসরের পর থেকে মাগরিবের আগ পর্যন্ত। আমাদের উচিত এই দুই সময়ে দোয়া করা। একইসঙ্গে দিনের যখনই সুযোগ পাওয়া যায়, তখনই দোয়া করা।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) জুমার দিনের উল্লেখ করে বলেন—‘এই দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া অবস্থায় আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চায়, তাহলে তিনি তাকে অবশ্যই তা দান করেন। আর তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত।’(বুখারি: ৯৩৫, মুসলিম: ৮৫২)

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘জুমার দিন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দেন। তোমরা সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান করো।’ (আবু দাউদ: ১০৪৮)

যে অনর্থক কাজগুলো জুমার সওয়াবকে বরবাদ করে
খুতবার সময় সকল প্রকার কাজ অহেতুক কাজের অন্তর্ভুক্ত। আর অহেতুক বা অনর্থক কাজ জুমার সওয়াবকে নষ্ট করে দেয়। নিচে কয়েকটি অহেতুক কাজের উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

খুতবার সময় কথা বলা
পাশের কেউ কথা বলতে থাকলে তাকে কথা বলতে নিষেধ করা
মোবাইল ফোনে কোনো কাজ করা
মসজিদের দানবাক্স চালানো
মসজিদের জন্য দান উঠানো
উপস্থিত মুসল্লিগণকে ডিঙ্গিয়ে বা দুই জনের মাঝে ফাঁকা করে সামনে অগ্রসর হওয়া
পরে থাকা একটা পাথর স্পর্শ করাও অনর্থক কাজ

আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি (খুতবা চলাকালীন সময়ে) কাঁকর স্পর্শ করল (অর্থাৎ বেখেয়ালে একটা পরে থাকা পাথর স্পর্শ করল), সে অনর্থক কর্ম করল।’ (অর্থাৎ সে জুমার সওয়াব বরবাদ করে দিল।) (মুসলিম)

পাশের সাথীকে চুপ করতে বললেও তা একটি অনর্থক কাজ। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (স.) বলেছেন, জুমার দিন যখন তোমার পাশের মুসল্লীকে চুপ থাকো বলবে, অথচ ইমাম খুতবা দিচ্ছেন, তুমি একটি অনর্থক কথা বললে। (বুখারি: ৯৩৪)
উপস্থিত মুসল্লিদেরকে ডিঙ্গিয়ে সামনে যাওয়া অনর্থক কাজ। জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জুমার দিন রাসুলুল্লাহ (স.)-এর খুতবারত অবস্থায় এক ব্যক্তি মাসজিদে প্রবেশ করলো। লোকের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সে সামনের দিকে যাচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন— তুমি বসো, তুমি (অন্যকে) কষ্ট দিয়েছ এবং অনর্থক কাজ করেছ। (ইবনে মাজাহ: ১১১৫)

জুমার দিনে মহিলাদের আমল
যে আমলগুলো মসজিদে যাওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেগুলো মূলত পুরুষদের জন্য। বাকি যে আমলগুলো রয়েছে (যেমন সুরা কাহফ পড়া, দরূদ পড়া, দোয়া করা ইত্যাদি) এগুলো নারী পুরুষ সকলেই করতে পারেন। এক্ষেত্রে অনেক নারীরাই মসজিদে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত আমলগুলোর সওয়াব না পাওয়ার ক্ষেত্রে আক্ষেপ করে থাকেন। তাদের জন্য আলেমগণের বক্তব্য হচ্ছে, আপনারা উক্ত আমলগুলোর ব্যাপারে বাড়ির মাহরাম পুরুষদেরকে সহযোগিতা করতে পারেন। তাদেরকে উক্ত আমলগুলোর ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনিও ইনশাআল্লাহ ওই আমলের সওয়াব পেয়ে যাবেন। কারণ কেউ কোনো ভালো কাজের দিকে অপরকে আহ্বান করলে, সেই আহ্বানকারীও উক্ত ভাল কাজের সওয়াব পেয়ে থাকেন। একই ভাবে কেউ কাউকে কোনো খারাপ কাজের দিকে উদ্বুদ্ধ করলে, সেই খারাপ কাজের গুনাহের ভাগীদারও তাকে হতে হবে। এভাবে নারীরাও উপরের আমলগুলোর পূর্ণ সওয়াব হাসিল করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মাসনুন আমলগুলোর মাধ্যমে জুমার ফজিলত হাসিল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর