আধুনিক শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম ইসলামি শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে প্রতিদিন। ধর্মহীনতার ফলে মুসলিম সমাজ-কাঠামোতে নানামুখী সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। মুলহিদ বা ধর্মহীন ব্যক্তির পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লামা ইবনে আশুর (রহ.) লেখেন, ‘যখন মধ্যপন্থাকে সত্য ও সঠিকের সঙ্গে তুলনা করা হয় তখন ধর্মহীনতা বলা হবে মধ্যপন্থা ছেড়ে বাতিলের প্রতি ঝুঁকে যাওয়াকে এবং কুফরি ও বিশৃঙ্খলাকে।’ (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির: ৯/১৮৯)
মূলত ইসলামি শিক্ষার অভাবে মুসলিম সমাজ এমন বাস্তবতার সম্মুখীন। উঠে যাচ্ছে ঈমানি চেতনা। ফলে জিন্দিক (নবীজির নবুয়তের কথা মুখে স্বীকার করলেও অন্তরে কুফরি লালনকারী) ও মুরতাদের (প্রকাশ্যে কুফুরির ঘোষণাকারী) সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। আরেকটি শ্রেণি আছে যারা পরকালকেই বিশ্বাস করে না। তাদেরকে বলা হয় দাহরি।
বিজ্ঞাপন
মুসলিমসমাজে ধর্মহীনতার সূচনা হয় বিশ্বাসগত বিকৃতির মাধ্যমে। যার অন্তরালে ছিল নবুয়তকে অস্বীকার করা। কিন্তু তাদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনার মতো। যেমন—ইবনে রাওয়ান্দি (মৃত্যু ৯১১ খ্রি)। এছাড়া এমন একদল দার্শনিকের জন্ম হয়, যারা বাহ্যত মুসলিম হলেও আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলি ও নবুয়তের নানা দিক এমনভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছে, যার মাধ্যমে ধর্মের প্রতি তাদের অবিশ্বাসই প্রকাশ পায়। (প্রবন্ধ: আল-ইলহাদু ওয়া আসারুহু আলাল ফারদি ওয়াল মুজতামায়ি, পৃষ্ঠা-৮)
আধুনিক যুগে ধর্মহীনতা প্রসারের নানাবিধ কারণগুলোর মধ্যে ঔপনিবেশিক শাসন, পুঁজিবাদ, ইউরোপীয়দের তুলনায় পিছিয়ে থাকা, অজ্ঞতা, মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর নির্ভরতা অন্যতম। এসব কারণে মানবজীবনে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। বাড়ছে বহুমুখী নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা। যেমন— ১. উদ্দেশ্যহীন জীবন, ২. মানসিক অস্থিরতা, ৩. অপরাধপ্রবণতা, ৪. প্রবৃত্তির দাস, ৫. পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলা।
মুসলিমবিশ্বকে ধর্মহীনতা থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ ও আয়োজন। মৌলিকভাবে সেগুলোকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যেমন—
এক. তাওহিদের দাওয়াত
তাওহিদ বা একত্ববাদের দাওয়াতই ইসলামের মূলকথা। একত্ববাদের বিশ্বাস বান্দার মনে দৃঢ় হলে সে ধর্মহীনতার বিষ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবে। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমি প্রত্যেক জাতির কাছে রাসুল পাঠিয়েছি এই মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত পরিহার করো।’ (সুরা নাহল: ৩৬)
বিজ্ঞাপন
দুই. ধর্মীয় শিক্ষায় গুরুত্বারোপ
শিক্ষাজীবনে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ধর্মহীনতার সয়লাব থেকে আত্মরক্ষা করা সম্ভব। আল্লাহ বলেন, ‘কেন তাদের প্রত্যেক দলের একাংশ বের হয় না, যাতে তারা দীন সম্পর্কে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে, যাতে তারা সতর্ক হয়।’ (সুরা তাওবা: ১২২)
তিন. বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ
দীনের ব্যাপারে সংশয় দূর করতে বহুমুখী বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন। যাতে থাকবে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামের সঠিক বক্তব্য তুলে ধরা এবং লেখনির মাধ্যমে সংশয়বাদীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া।
সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.) বলেন, ‘ইসলামি বিশ্বের উচিত- তাদের মেধা-মনন, দীনি কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক শক্তিগুলোকে এসব ধর্মহীন যুবক ও শিক্ষিত তরুণদের সেবায় নিয়োজিত করা। যেন তারা ইসলামের মৌলিকত্ব, তার বিশ্বাসগুলো, প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য, নীতিমালা ও জীবনব্যবস্থা এবং রিসালাতে মুহাম্মদির মর্মকথা বুঝতে পারে। আর এই প্রচেষ্টা ততদিন অব্যাহত রাখতে হবে, যতদিন না চিন্তার ব্যাধি ও মানসিক অস্থিরতা দূর হয়ে যায় এবং জ্ঞান, বুদ্ধি ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ইসলামের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যায়।’ (রিদ্দাতুন, ওয়ালা আবা বাকরিন লাহা, পৃষ্ঠা-১৯)
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে দীনি শিক্ষা অর্জন, বিশ্বাস ও কাজের শক্তি দান করুন। আমিন।

