ইউসুফ ইসলাম। লন্ডনের বহুল আলোচিত নওমুসলিম। জন্ম ১৯৪৮ সালের ২১ জুলাই। আগের নাম স্টিফেন ডিমেট্রি জর্জিও। ক্যাট স্টিভেন্স নামে পরিচিত এই জনপ্রিয় পপ স্টার পাশ্চাত্যের চাকচিক্যময় পপ জগৎ ছেড়ে দিয়েও কীভাবে আধুনিক ও বরেণ্য ইসলামিস্ট হিসেবে বাঁচা যায় তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।

বিজ্ঞাপন
ইসলাম গ্রহণের পর শত প্রতিকূলতায়ও থেমে যাননি ইউসুফ। জনপ্রিয়তার ছিটেফোটাও কমেনি। মানবতা ও শান্তির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ‘ওয়ার্লড অ্যাওয়ার্ড’, ‘ম্যান ফর পিস অ্যাওয়ার্ড-সহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী ইউসুফ ইসলাম। তিনি একাধারে একজন মানবতাবাদী, শিক্ষাগুরু, গায়ক, গীতিকার, মাল্টি ইনস্ট্রুমেন্টালিস্টস। বর্তমানে ইসলামের অপার সৌন্দর্য প্রচারে নিরলস কর্মযজ্ঞই তার শক্তি।
১৯৭৬ সালের ছোট একটি দুর্ঘটনার পর তার জীবনের মোড় পুরোপুরি পাল্টে যায়। ঘটনার দিন আমেরিকার ম্যালিবু বিচে সাতার কাটতে যেয়ে প্রায় ডুবতে বসেছিলেন। তখন তিনি মৃত্যুভয়ে চিৎকার করে উঠেন, “Oh God! If you save me, I will work for you.” বলতে না বলতেই অপ্রত্যাশিত উল্টো একটি ঢেউ তাকে তীরে আছড়ে ফেলে! এ ঘটনার পর ক্যাট স্টিভেন্সের মনে আমূল পরিবর্তন আসে। পাশ্চাত্যের জড়বাদী জগতের পিছনে না দৌড়ে সত্য অনুসন্ধানে ঝুঁকে পড়েন। শুরুতে বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, রাশিফল, অ্যাস্ট্রলজি, নিউমারলজি, টেরট কার্ড ইত্যাদি তুলনামূলক পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করেন। ইসলামকে জানারও আগ্রহ তৈরি হয়। ভাই ডেভিডের সংরক্ষণে থাকা এক কপি কোরআন হাতে নিয়ে স্টাডি করতে থাকেন। ইতোমধ্যে মরক্কো ঘুরতে যেয়ে জীবনে প্রথমবার আজানের ধ্বনি শুনতে পান। ঐশ্বরিক বার্তাগুলোর অর্থ বুঝে অভিভূত হয়ে পড়েন। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করতে মসজিদে আহ্বান করা নিয়ে স্টিভেন্স ভাবেন, জীবনে টাকার জন্য গান করতে শুনেছি বা খ্যাতির জন্য। কিন্তু ঐশ্বরিক গান? এটা কীভাবে সম্ভব! কনসেপ্ট অসাধারণ! মূলত এই ভ্রমণেই তিনি ইসলাম ধর্মের প্রতি অনন্য এক টান অনুভব করেন।
সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন ক্যাট স্টিভেন্স। কোরআনে বর্ণিত নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামের নামে নিজের নাম রাখেন ‘ইউসুফ ইসলাম’।

বর্তমানে ইংল্যান্ডে মুসলিম কমিউনিটিতে ইউসুফ ইসলাম জনপ্রিয় এক ব্যক্তিত্ব। ইউসুফ ইসলাম ১৯৮৩ সালে লন্ডনে ইসলামিয়া স্কুল ও ১৯৮৯ সালে ইসলামি গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল মুসলিম কমিউনিটির জন্য নিয়ামত। এরপর একে একে ধর্মীয় প্রচার-প্রসারমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিত গড়েন। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা মুসলিম এইডের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম সাহায্য সংস্থার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশে যুদ্ধকবলিত ক্ষতিগ্রস্থ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যস্ত মানুষকে সহায়তা দিয়ে থাকে সংস্থাটি। আফ্রিকা, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া এবং কসোভোতে হাজার হাজার দুস্থ পরিবার এবং এতিম শিশুকে পুনর্বাসন করেছে। বাংলাদেশে অনেকদিন ধরে এই সংস্থাটি বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এছাড়াও ‘ক্যাট স্টিভেনস মিউজিক‘ হতে আয়ের প্রায় পুরোটা ইসলাম প্রচার প্রসার এবং বিভিন্ন ত্রাণ কার্যে দান করা হয়।
ইউসুফ ইসলামফোবিয়া ও বর্ণবাদবিরোধী ফোরাম এফএআইআর প্রতিষ্ঠা করেন। ভিন্ন বর্ণ-ধর্ম বিশ্বাসের বিরূদ্ধে নানা বৈষম্যমূলক নীতি, আইনের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি।
ইউনিসেফ এর বিশেষ দূত হয়ে ক্যাট স্টিভেন্স যুদ্ধবিধ্বস্থ বাংলাদেশেও ভ্রমণ করেছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, পটুয়াখালি, ভোলা, রংপুর ইত্যাদি স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
দুস্থ-অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের করুণ অবস্থা ইউসুফকে বরাবরই নাড়া দেয়। যুদ্ধবিদ্ধস্ত ফিলিস্তিনে সহয়তা দিতে আগ্রহী ইউসুফ ইসলাম। যদিও এ কারণে তাকে ভুগতে হয়েছে। ফিলিস্তিনের হামাসকে সহায়তা করা এবং সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ কয়েকটি দেশে তার অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুরাগ কীভাবে— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন—
“আমার জীবন ও চেতনার জগতকে পালটে দিয়েছে মহাগ্রন্থ কোরআন। আমার মনের সকল প্রশ্নের জবাব এই গ্রন্থে পেলাম। আমি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। আমি মুসলমান হয়ে গেলাম।”
ইসলামকে যারা ১৪ শ’ বছরের পুরাতন এবং এ যুগের জন্যে অচল বলে থাকেন, তাদের সম্পর্কে ইউসুফ ইসলামের বক্তব্য— “বিনয়ের সাথেই বলছি, যারা এসব বলেন, তারা নিজেদের মনে স্থান করে নেয়া ইসলাম সম্পর্কে পূর্ব ধারণার বশবর্তী হয়েই ইসলামকে বিচার করে। যদি সঠিকভাবে তারা এ ব্যাপারে জানতে চাইতো তবে তাদের উক্তি হতো ইতিবাচক।”
এমএ/

