রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

গোপনে দান করার সওয়াব

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:০৯ এএম

শেয়ার করুন:

গোপনে দান করার সওয়াব

মানবতার আদর্শ হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনের মহিমান্বিত অভ্যাস ছিল উদারচিত্তে দান করা। দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানোকে বড় ইবাদত বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। অন্যের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা নিজের সম্পদ দিনে বা রাতে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে আল্লাহর পথে খরচ করে তাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে। তাদের কোনো ভয় নেই। তাদের কোনো চিন্তাও নেই।’ (সুরা বাকারা: ২৭৪)

প্রকাশ্য দান-সদকায়ও সওয়াব আছে, যদি রিয়ার মনোভাব না থাকে। তবে, গোপন দান আল্লাহ খুব পছন্দের আমল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো ভালো। আর যদি গোপনে দান করো এবং অভাবগ্রস্তকে দাও তা তোমাদের জন্য অধিক ভালো। (সুরা আল বাকারা: ২৭১)

রিয়া বা লোকাদেখানোর জন্য যে দান-সদকা করা হয়, ফটো-শুট করার জন্য এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে প্রশংসা কুড়ানোর নিয়তে যারা দান করেন তাদের জন্য কোনো সওয়াব নেই। বরং তারা খুব বাজে পরিণামের অপেক্ষায় আছে। মুমিনের ইবাদত ধ্বংস করে তাকে জাহান্নামি বানানোর জন্য শয়তানের অন্যতম ফাঁদ এই ‘রিয়া’।

মাহমুদ ইবনে লাবিদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—‘আমি যে বিষয়টি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, তা হলো শিরকে আসগর (ছোট শিরক)। সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! শিরকে আসগর কী? তিনি বলেন, রিয়া বা লোক দেখানো আমল। কেয়ামতের দিন যখন মানুষকে তাদের কর্মের প্রতিফল দেওয়া হবে, তখন মহান আল্লাহ তাদের বলবেন, তোমরা যাদের দেখাতে তাদের কাছে যাও, দেখো তাদের কাছে তোমাদের পুরস্কার পাও কি না!’’ (আহমদ, আল-মুসনাদ ৫/৪২৮-৪২৯; হাইসামী, মাজমাউয জাওয়াইদ ১/১০২। হাদিসের মান- সহিহ)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, দানের কথা প্রচার করো না এবং কষ্ট দিয়ে (খোঁটা দিয়ে) তোমাদের দান ওই ব্যক্তির মতো ব্যর্থ করো না, যে নিজের ধন সম্পদ কেবল লোক দেখানোর জন্যই ব্যয় করে..।’ (সুরা বাকারা: ২৬৪)

গোপন দানের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন যখন আরশের ছায়া ছাড়া কোন ছায়া থাকবে না, আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণির মানুষকে তাঁর আরশের নিচে আশ্রয় দেবেন। তাদের মধ্যে একজন হলো ওই ব্যক্তি, যে এতো গোপনে দান করত যে, তার ডান হাতের দান বাম হাতও টের পেত না। (বুখারি: ৬৬০, মুসলিম: ১০৩১)

সাহাবিদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল গোপনে নেক আমল করা। আবু বকর (রা.) চুপিসারে গিয়ে এক বৃদ্ধার খেদমত করে আসতেন এবং তাকে খাইয়ে দিতেন। এটি জেনে যান হজরত ওমর (রা.)। এবার তিনিও সেই বৃদ্ধার খেদমত করার সুযোগ খুঁজতেন। আলী বিন যাইনুল আবিদিন (রহ.) নিজ কাঁধে করে বস্তিবাসীদের নিকট খাবার পৌঁছাতেন অথচ তাদের তিনি নিজের পরিচয় দিতেন না। তিনি মারা যাওয়ার পর বস্তিবাসীর মধ্যে খাবারের জন্য হাহাকার শুরু হয়। তাঁর পিঠে দাগ দেখে তখন সবাই বুঝতে পারে যে, এতদিন সংগোপনে তিনিই খাবার পৌঁছে দিতেন। এমন উদাহরণ সাহাবি-তাবেয়িনদের মাঝে অসংখ্য।

ইবনুল কায়্যিম (রহ) বলেন, পূর্বসূরি নেককারদের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তারা অন্তত একটি বিশেষ নেক আমল এতটাই গোপন রাখতেন যে, তাদের স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যরাও জানতেন না। এর কারণ হলো, অন্তত এই একটি আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে যাতে পুরোপুরি পরিতুষ্ট ও নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

সালাফদের মতে, গুনাহকে যেভাবে গোপন রাখা হয়, সেভাবে নেক আমলগুলোকেও গোপন রাখা উচিত। বরং তা আরো বেশি গোপন রাখা উচিত। কারণ, গোপন নেক আমলের ওসিলায় ফেতনা ও পরীক্ষার সময় দীনের উপর অবিচল থাকা সহজ হয়। ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যু-যন্ত্রণা ও কেয়ামতের দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়, সে যেন প্রকাশ্যে আমলের চেয়ে গোপনে অধিক আমল করে।’ (তারতিবুল মাদারিক ওয়া তাক্বরিবুল মাসালিক)

তাই আসুন! আমরা লোক দেখানো দান না করে প্রভুকে সন্তুষ্ট করার জন্য দান করি। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর