বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নবীজির জন্মতারিখ নিয়ে মতভেদ কেন, ১২ রবিউল আউয়াল কতটা নির্ভরযোগ্য?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

শেয়ার করুন:

নবীজির জন্মতারিখ নিয়ে মতভেদ কেন, ১২ রবিউল আউয়াল কতটা নির্ভরযোগ্য?
ছবি: এআই

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্ম সোমবারে হয়েছিল-এ কথা সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। তবে রবিউল আউয়াল মাসের কত তারিখে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে আলেম ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ১২ রবিউল আউয়াল সবচেয়ে প্রচলিত মত হলেও এটিকে নিশ্চিত ও চূড়ান্ত জন্মতারিখ বলা যায় না।

সোমবারে জন্মের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল

হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, সোমবারের রোজা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

অর্থাৎ তাঁর জন্মের বার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য দলিল রয়েছে। মতভেদ রয়েছে রবিউল আউয়াল মাসের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে।

জন্মতারিখ নিয়ে এত মতভেদ কেন

প্রাচীন আরব সমাজে বর্তমান সময়ের মতো জন্মতারিখ সংরক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। বড় কোনো ঘটনা দিয়ে বছরকে চিহ্নিত করার প্রচলন ছিল। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মবর্ষ ‘আমুল ফিল’ বা হস্তী বর্ষ নামে পরিচিত।

ফলে তাঁর জন্মের সঠিক তারিখ নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম নববি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) রবিউল আউয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন- এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। তবে তারিখ নিয়ে ২, ৮, ১০ ও ১২ রবিউল আউয়ালের মত পাওয়া যায়। ইবনে সাইয়িদ আন-নাস ৯ রবিউল আউয়ালের কথাও উল্লেখ করেছেন। (তাহজিবুল আসমা: ১/২৩, উয়ুনুল আসার: ১/৪১)

তাই ১২ রবিউল আউয়ালকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নিশ্চিত জন্মতারিখ বলা যায় না। এটি একটি প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত মত, তবে এ বিষয়ে সহিহ ও চূড়ান্ত দলিল নেই।

আরও পড়ুন: নবীজি (স.)-এর জন্মদিন পালন নিয়ে ইসলামে কী বলা হয়েছে?

১২ রবিউল আউয়াল এত প্রচলিত হলো কেন

১২ রবিউল আউয়ালের মতটি প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ। সীরাতের প্রাচীন সংকলক ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (স.) হস্তী বর্ষের ১২ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সীরাতগ্রন্থগুলোতেও এই মত ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। (সিরাতে ইবনে হিশাম: ১/১৫৮)

তবে ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এই তারিখের উল্লেখ থাকলেই এটিকে সহিহ হাদিসের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যায় না। জন্মতারিখের বিভিন্ন বর্ণনার সনদ ও ঐতিহাসিক ভিত্তি এক নয়। ইবনে কাসিরও এ বিষয়ে একাধিক মত উল্লেখ করেছেন এবং ১২ রবিউল আউয়ালকে প্রসিদ্ধ মত হিসেবে তুলে ধরেছেন। (সিরাতুন নববিয়্যাহ: ১/১৬০)

অতএব ১২ রবিউল আউয়ালকে ‘প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মত’ বলা যায়, তবে ‘নিঃসন্দেহে প্রমাণিত জন্মতারিখ’ বলা যায় না।

৮ ও ৯ রবিউল আউয়ালের মতও রয়েছে

১২ তারিখের পাশাপাশি ৮ ও ৯ রবিউল আউয়ালের মতও গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে কাসিরের আলোচনায় ৮ রবিউল আউয়ালের মত পাওয়া যায়। আবার প্রখ্যাত সীরাতগ্রন্থ ‘আর-রাহিকুল মাখতুম’-এ ৯ রবিউল আউয়ালকে জন্মতারিখ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। (আর-রাহিকুল মাখতুম: ১/৪৫)

পরবর্তী সময়ে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবের মাধ্যমেও রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মতারিখ নির্ধারণের চেষ্টা হয়েছে। মিসরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাহমুদ পাশা আল-ফালাকি হিসাব করে ৯ রবিউল আউয়ালকে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী সেটি ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিলের সঙ্গে মিলে যায়।

তবে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবকেও চূড়ান্ত ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ধরা যায় না। কারণ হিজরতের আগের আরব ক্যালেন্ডার, নাসি প্রথা এবং তৎকালীন সময়গণনার বিভিন্ন বিষয় এ ধরনের হিসাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এসব হিসাব ঐতিহাসিক বর্ণনা যাচাইয়ের সহায়ক হতে পারে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি নয়।

আরও পড়ুন: মিলাদুন্নবী এলে সাহাবিরা কী করতেন

১২ রবিউল আউয়াল কি তাহলে ভুল?

এভাবে সরাসরি বলা ঠিক হবে না। ১২ রবিউল আউয়াল প্রাচীন সীরাতের একটি প্রসিদ্ধ মত। ইবনে ইসহাকসহ প্রাচীন সূত্রে এর উল্লেখ রয়েছে। ফলে এটিকে ভিত্তিহীন বা মনগড়া তারিখ বলা সঠিক নয়।

একইসঙ্গে এটিকে এমন একটি তারিখও বলা যাবে না, যা সহিহ হাদিসে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত। এখানে মূল বিষয় হলো- ‘প্রসিদ্ধ মত’ আর ‘নিশ্চিত দলিল’ এক বিষয় নয়।

ইন্তেকালের তারিখের সঙ্গেও ১২ রবিউল আউয়ালের সম্পর্ক

১২ রবিউল আউয়াল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইন্তেকালের তারিখ হিসেবেও মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে পরিচিত। একাধিক ঐতিহাসিক ও সীরাতগ্রন্থে ১১ হিজরির রবিউল আউয়ালে তাঁর ইন্তেকালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১২ তারিখের মতটি প্রসিদ্ধ। (আর-রওদুল উনুফ: ৪/৪৩৯-৪৪০; সিরাতুন নববিয়্যাহ: ৪/৫০৯; ফাতহুল বারি: ৮/১৩০)

তবে ইন্তেকালের তারিখ নিয়েও কিছু মতভেদ রয়েছে। ফলে জন্ম ও ইন্তেকাল উভয় ক্ষেত্রেই ১২ রবিউল আউয়ালকে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ মত হিসেবে উল্লেখ করা যায়, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তারিখ হিসেবে নয়।

তাহলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে কী বলা যায়?

দলিলের বিচারে সবচেয়ে নিশ্চিত তথ্য হলো, রাসুলুল্লাহ (স.) সোমবার জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁর জন্ম হস্তী বর্ষে হয়েছিল- এটিও সীরাতের সুপরিচিত তথ্য। তাঁর জন্ম রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছিল- এটিও সীরাতের প্রসিদ্ধ মত।

কিন্তু রবিউল আউয়ালের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। ১২ রবিউল আউয়াল সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মতগুলোর একটি। পাশাপাশি ৮, ৯ ও ১০ রবিউল আউয়ালের মতও প্রাচীন সূত্রে পাওয়া যায়। আধুনিক গবেষণায় ৯ রবিউল আউয়ালকে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টাও হয়েছে।

তাই সবচেয়ে সতর্ক বক্তব্য হবে- রাসুলুল্লাহ (স.) সোমবার, হস্তী বর্ষে এবং রবিউল আউয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে মাসের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে এবং ১২ রবিউল আউয়াল একটি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মত।

মতভেদ নিয়ে আমাদের করণীয়

জন্মতারিখের এই মতভেদ নিয়ে কোনো একটি মতকে এমনভাবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়, যেন সেটিই দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত। একইভাবে প্রচলিত ১২ রবিউল আউয়ালকে ভিত্তিহীন বলাও সঠিক নয়।

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকলেও তাঁর নবুয়ত, চরিত্র, শিক্ষা ও সুন্নাহ সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহর কাছে কোনো সংশয় নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)

তাই জন্মতারিখের মতভেদ নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ না থেকে রবিউল আউয়ালকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সীরাত পাঠ, তাঁর আদর্শ জানা এবং জীবনে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের উপলক্ষ হিসেবে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সারকথা, রাসুলুল্লাহ (স.) সোমবার জন্মগ্রহণ করেছেন, এটি সহিহ হাদিসে প্রমাণিত। তাঁর জন্ম রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছিল, এটি সীরাতের প্রসিদ্ধ তথ্য। তবে ১২ রবিউল আউয়ালকে জন্মতারিখ হিসেবে সহিহ হাদিসে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যায় না। ৮, ৯ ও ১০ রবিউল আউয়ালসহ আরও কয়েকটি মত রয়েছে। তাই ১২ রবিউল আউয়ালকে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মত হিসেবে উল্লেখ করাই বেশি সতর্ক ও দলিলসম্মত। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।

তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম: ১১৬২; সিরাতে ইবনে হিশাম: ১/১৫৮; তাহজিবুল আসমা: ১/২৩; সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ: ১/১৬০; উয়ুনুল আসার: ১/৪১; আর-রাহিকুল মাখতুম: ১/৪৫; ফাতহুল বারি: ৮/১৩০

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর