মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিছানা ও বালিশ কেমন ছিল?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম

শেয়ার করুন:

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিছানা ও বালিশ কেমন ছিল?
প্রতীকী ছবি: এআই

আজকের পৃথিবীতে আরামদায়ক জীবনযাপনের জন্য মানুষ নরম গদি, দামি বিছানা ও বিলাসবহুল আসবাবের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। কিন্তু মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, আল্লাহর রাসুল হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। ঘর, পোশাক ও খাদ্যাভ্যাসের মতো তাঁর ব্যবহৃত বিছানা ও বালিশও ছিল সাধারণ। তবু সেই জীবনেই ছিল প্রকৃত তৃপ্তি, প্রশান্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অনন্য দৃষ্টান্ত।

অনেকেরই জানার আগ্রহ থাকে- রাসুলুল্লাহ (স.) কেমন বিছানায় শুতেন? তাঁর বালিশ কেমন ছিল? এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে মূল্যবান বর্ণনা সংরক্ষিত রয়েছে।

খেজুরপাতার চাটাই ছিল তাঁর বিছানা

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ (স.) খেজুরপাতার বোনা একটি চাটাইয়ের ওপর শুয়েছিলেন। ঘুম থেকে ওঠার পর চাটাইয়ের দাগ তাঁর শরীরে স্পষ্ট হয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি চাইলে আমরা আপনার জন্য আরও আরামদায়ক বিছানার ব্যবস্থা করতে পারি।’

তিনি জবাবে বলেন, ‘দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়ায় আমার দৃষ্টান্ত সেই পথিকের মতো, যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়, তারপর তা ছেড়ে নিজের পথে চলে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৩৭৭; মুসনাদে আহমাদ: ৩৭০৪)

বিছানায় ছিল খেজুরের আঁশ

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরি। এর ভেতরে খেজুর গাছের আঁশ ভরা থাকত।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪৫৬)

এ থেকেই বোঝা যায়, তাঁর বিছানায় দামি তুলা বা পশম নয়, বরং সহজলভ্য খেজুরের আঁশ ব্যবহার করা হতো।

আরও পড়ুন: এশার পর ঘুম: নববী রুটিনের হেকমত

বালিশও ছিল সাধারণ

হজরত আয়েশা (রা.) আরও বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ঘুমানোর বালিশটি ছিল চামড়ার তৈরি এবং তার ভিতর ছিল খেজুর গাছের ছাল-বাকলে ভরা।’ (তিরমিজি: ২৪৬৯)

তাঁর ব্যবহৃত বালিশও ছিল সাধারণ উপকরণে তৈরি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি বিলাসিতার পরিবর্তে সরলতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

লেপও ছিল সাধারণ

বিভিন্ন হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) একটি সাধারণ পশমি কম্বল বা লেপ ব্যবহার করতেন। কখনো সেটি দুই ভাঁজ করে বিছানা হিসেবে ব্যবহার করা হতো, আবার শীতের রাতে সেটিই গায়ে দিতেন। (শামায়েলে তিরমিজি: ৩২৮; আখলাকুন্নবী)

আরামদায়ক বিছানা পছন্দ করতেন না

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর এই জীবনযাপন কেবল অভাবের কারণে ছিল না। বরং তিনি সচেতনভাবেই বিলাসিতা এড়িয়ে চলতেন।

হজরত হাফসা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চটের বিছানাটি আগের চেয়ে কয়েক ভাঁজ করে দেন। পরদিন তিনি বলেন, ‘আমার বিছানাটি আগের মতো করে দাও। কারণ এর নরম ভাব আমাকে রাতে সালাত আদায়ে বাধা দিয়েছে।’ (শামায়েলে তিরমিজি: ৩২৮)

এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়, তিনি দেহের আরামের চেয়ে ইবাদতের সুবিধাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন।

আরও পড়ুন: নবীজির প্রিয় ৩ সুগন্ধি

ওমর (রা.)-এর চোখে পানি

একবার হজরত উমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ঘরে এসে দেখলেন, তিনি খেজুরপাতার বোনা একটি চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছেন। চাটাইয়ের দাগ তাঁর শরীরে স্পষ্ট হয়ে আছে। এ দৃশ্য দেখে ওমর (রা.)-এর চোখে অশ্রু চলে আসে।

রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন কাঁদছ?’

ওমর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! পারস্য ও রোমের বাদশাহরা কত বিলাসিতার মধ্যে জীবনযাপন করছে, আর আপনি আল্লাহর রাসুল হয়েও এমন সাধারণ বিছানায় শুয়ে আছেন!’

তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, দুনিয়া তাদের জন্য আর আখেরাত আমাদের জন্য?’ (সহিহ বুখারি: ৪৯১৩; সহিহ মুসলিম: ১৪৭৯)

শোয়ার সুন্নাহ ও দোয়া

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শোয়ার পদ্ধতিও ছিল সুন্নাহসম্মত। তিনি সাধারণত ডান কাতে শুতেন এবং ডান হাত গালের নিচে রাখতেন। ঘুমানোর আগে তিনি আল্লাহর জিকির ও বিভিন্ন দোয়া পাঠ করতেন। এর মধ্যে অন্যতম-

‘আল্লাহুম্মা বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহইয়া।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনারই নামে আমি মৃত্যুবরণ করি এবং আপনারই নামে জীবিত হই।’ (সহিহ বুখারি)

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সরল জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের মর্যাদা বিলাসিতায় নয়; বরং তাকওয়া, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আন্তরিক ইবাদতে। দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতকে প্রাধান্য দেওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ৪৯১৩, ৬৩১১, ৬৩২৪, ৬৪৫৬; সহিহ মুসলিম: ১৪৭৯, ২০৮২; সুনানে তিরমিজি: ২৩৭৭; শামায়েলে তিরমিজি: ৩২৮; মুসনাদে আহমাদ: ৩৭০৪

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর