প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ হলো ভূমিকম্প। এর তাণ্ডবের সামনে মানুষ, পশু-পাখি- সবকিছুই কতটা অসহায়, তা কয়েক সেকেন্ডের একটি প্রবল কম্পনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনবহুল এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে মাটি কেঁপে উঠতে পারে, সৃষ্টি হতে পারে বড় ফাটল, ধসে পড়তে পারে সুউচ্চ ভবন। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিক ভূমিকম্পের ঘটনায় মানুষের উদ্বেগও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে- ভূমিকম্পের সময় বা এর আগে পড়ার জন্য কোরআন-হাদিসে কি কোনো বিশেষ দোয়ার কথা বলা হয়েছে?
সহিহ হাদিসে ভূমিকম্পের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া রাসুলুল্লাহ (স.) শিখিয়েছেন বলে প্রমাণিত নয়। নির্ভরযোগ্য বর্ণনায়ও এ ধরনের কোনো দোয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে বিপদ-আপদ, আকস্মিক দুর্যোগ এবং মাটির নিচ থেকে আসা অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে পড়ার জন্য কয়েকটি শক্তিশালী মাসনুন দোয়া রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘বলুন, তিনি তোমাদের ওপর থেকে অথবা তোমাদের পদতলের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম...।’ (সুরা আনআম: ৬৫)
নিচে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে প্রমাণিত দোয়াগুলো তুলে ধরা হলো।
১. নিচ থেকে আসা আজাব থেকে আশ্রয়ের দোয়া
ভূমিকম্পের পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) প্রতিদিন দোয়াটি সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করতেন। দোয়ার শেষ অংশে তিনি নিচের দিক থেকে আকস্মিক বিপদে আক্রান্ত হওয়া থেকে আশ্রয় চাইতেন।
দোয়াটি হলো- اللَّهُمَّ احْفَظْنِي مِنْ بَيْنِ يَدَيَّ، وَمِنْ خَلْفِي، وَعَنْ يَمِينِي، وَعَنْ شِمَالِي، وَمِنْ فَوْقِي، وَأَعُوذُ بِعَظَمَتِكَ أَنْ أُغْتَالَ مِنْ تَحْتِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাহফাযনি মিন বাইনি ইয়াদাইয়্যা, ওয়া মিন খালফি, ওয়া আন ইয়ামিনি, ওয়া আন শিমালি, ওয়া মিন ফাওকি, ওয়া আউযু বি-আযামাতিকা আন উগতালা মিন তাহতি।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাকে আমার সামনে, পেছনে, ডান পাশ, বাম পাশ ও ওপরের দিক থেকে হেফাজত করুন। আর আপনার মহত্ত্বের উসিলায় আমি নিচের দিক থেকে আকস্মিকভাবে আক্রান্ত হওয়া থেকে আপনার আশ্রয় চাই।’ (আবু দাউদ: ৫০৭৪; ইবনে মাজাহ: ৩৮৭১)
আরও পড়ুন: ভূমিকম্পে দোয়া মনে না এলে যে তিন শব্দ যথেষ্ট
আলেমরা এই দোয়ার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, ‘নিচের দিক থেকে আক্রান্ত হওয়া’ বলতে ভূমিধস, মাটিধস, ভূমিকম্প বা এ ধরনের আকস্মিক বিপদও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। দুর্যোগের সময় এই দোয়াটি পাঠ করা অত্যন্ত উপযোগী।
২. আকস্মিক বিপদ থেকে আশ্রয়ের দোয়া
ভূমিকম্প সাধারণত কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই আঘাত হানে। তাই হঠাৎ বিপদ ও শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য রাসুলুল্লাহ (স.) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিখিয়েছেন।
দোয়াটি হলো- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ وَتَحَوُّلِ عَافِيَتِكَ وَفُجَاءَةِ نِقْمَتِكَ وَجَمِيعِ سَخَطِكَ
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় চাই আপনার দেওয়া নেয়ামত চলে যাওয়া থেকে, আপনার দেওয়া সুস্থতা ও নিরাপত্তা পরিবর্তিত হওয়া থেকে, হঠাৎ আপনার শাস্তি নেমে আসা থেকে এবং আপনার সব ধরনের অসন্তুষ্টি থেকে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৯)
৩. আগে সতর্কতা, এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা
দোয়ার পাশাপাশি সর্বাত্মক প্রস্তুতিরও শিক্ষা দেয় ইসলাম। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি তার উট না বেঁধে রেখে বললেন, ‘আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম।’ তখন রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘আগে উটটি বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (তিরমিজি: ২৫১৭)
আরও পড়ুন: আল্লাহর ওপর যারা তাওয়াক্কুল করে তাদের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ভবন নির্মাণের সময় নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া, নিরাপদ বহির্গমন পথ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা একজন মুসলমানের দায়িত্ব। এগুলো আল্লাহর ওপর ভরসার পরিপন্থী নয়, বরং তাওয়াক্কুলেরই অংশ।
৪. তাওবা-ইস্তেগফার বা আল্লাহর দিকে ফিরে আসা
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের অসহায়ত্ব এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার স্মারক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের ওপর যে বিপদই আসে, তা আমি সৃষ্টি করার আগেই একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।’ (সুরা হাদিদ: ২২)
এমন পরিস্থিতিতে বেশি বেশি তওবা, ইস্তেগফার ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, প্রতিটি দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (আবু দাউদ: ১৫১৮)
বর্ণিত আছে, মদিনায় একবার ভূকম্পন অনুভূত হলে খলিফা ওমর (রা.) মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং নিজেদের আমল পর্যালোচনার আহ্বান জানান। আলেমরা বলেন, দুর্যোগ মানুষের জন্য আত্মসমালোচনা, তওবা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
দুর্যোগের মুহূর্তে একজন মুমিনের করণীয়
- শান্ত থাকা: আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া
- দোয়া ও জিকির করা: কালিমা, ইস্তেগফার এবং মাসনুন দোয়াগুলো বেশি বেশি পড়া
- আল্লাহর কাছে ফিরে আসা: তওবা করা এবং নিজের আমল পর্যালোচনা করা
- অন্যকে সহযোগিতা করা: নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরিবার, প্রতিবেশী ও আহত মানুষের পাশে দাঁড়ানো
- গুজব না ছড়ানো: যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা
ভূমিকম্প মানুষের অসহায়ত্ব এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সহিহ হাদিসে ভূমিকম্পের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বর্ণিত হয়নি। তবে বিপদ থেকে নিরাপত্তা চাওয়ার একাধিক মাসনুন দোয়া রয়েছে। তাই একজন মুমিনের করণীয় হলো নিয়মিত এসব দোয়া পাঠ করা, বেশি বেশি তওবা ও ইস্তেগফার করা এবং সেই সঙ্গে জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আকস্মিক বিপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, জামে তিরমিজি




