মহররম মাস এলেই মুসলিম সমাজে আশুরাকে ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়। এ সময় বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি চেনা রেওয়াজ চোখে পড়ে- আশুরার দিনে খিচুড়ি বা বিভিন্ন শস্যের মিশ্রণে বিশেষ খাবার রান্না করা। অনেকের দৃঢ় বিশ্বাস, এর সূত্রপাত হজরত নূহ (আ.)-এর কিশতি বা নৌকা থেকে।
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর নূহ (আ.)-এর কিশতি জুদি পাহাড়ে ভিড়লে যাত্রীদের কাছে অল্প পরিমাণ বিভিন্ন শস্য অবশিষ্ট ছিল। সেগুলো একত্র করে একটি খাবার রান্না করা হয়। পরবর্তীকালে সেই খাবারই 'আশুরার খিচুড়ি' নামে পরিচিতি পায়।
এই কাহিনির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে কি?
পবিত্র কোরআনে নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবন, নৌকা নির্মাণ এবং জুদি পর্বতে কিস্তি স্থির হওয়ার কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘বলা হলো, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গিলে ফেলো এবং হে আকাশ! তুমি বিরত হও। পানি কমে গেল, ফয়সালা সম্পন্ন হলো এবং কিশতি জুদি পর্বতে স্থির হলো।’ (সুরা হুদ: ৪৪)
কোরআনে নুহ (আ.)-এর ঘটনা ২৮টি সুরায় ৮১টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তবে এই আয়াত বা সংশ্লিষ্ট অন্যকোনো আয়াতে কিশতিতে শস্য মিশিয়ে খাবার রান্না করার কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি কিস্তি জুদি পাহাড়ে স্থির হওয়ার দিনটি যে আশুরা ছিল- সেটিও কোরআন থেকে প্রমাণিত নয়।
আরও পড়ুন: আশুরার রোজা একদিন নাকি দুদিন, ২০২৬ সালে কবে পড়বে?
আশুরার সঙ্গে নূহ (আ.)-এর ঘটনার সম্পর্ক কতটুকু?
কিছু হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থে বর্ণিত আছে যে নূহ (আ.)-এর নৌকা আশুরার দিনে জুদি পাহাড়ে স্থির হয়েছিল এবং তিনি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। মুসনাদে আহমদেও এরকম একটি বর্ণনা পাওয়া যায় (হাদিস: ৮৭১৭)
তবে হাদিসবিশারদদের একটি বড় অংশ এই বর্ণনার সনদকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) থেকে শুরু করে আধুনিক মুহাদ্দিসরা পর্যন্ত এ বিষয়ে একমত যে, বর্ণনাটি সহিহ ও নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপনযোগ্য নয়। সর্বোচ্চ বলা যায়, এটি দুর্বল সূত্রে বর্ণিত একটি ঐতিহাসিক কাহিনি।
খিচুড়ি রান্নার গল্পের কোনো দলিল আছে?
এখানেই মূল প্রশ্ন। নূহ (আ.)-এর কিশতিতে অবশিষ্ট চাল, ডাল, গম, ছোলা বা অন্যান্য শস্য একত্র করে খাবার রান্না করা হয়েছিল- এমন কোনো বর্ণনা কোরআনে নেই। সহিহ হাদিসের ছয়টি প্রধান গ্রন্থ বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ কোথাও এর উল্লেখ পাওয়া যায় না।
হাদিস গবেষক ও ইসলামি ইতিহাসবিদদের আলোচনায় এ কাহিনিকে সাধারণত লোকমুখে প্রচলিত বর্ণনা, ঐতিহাসিক কিসসা বা ইসরাইলিয়্যাতধর্মী বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখা হয়। ইসরাইলিয়্যাত বলতে বোঝায় সেসব বর্ণনা যা ইহুদি ও খ্রিষ্টান উৎস থেকে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে, কিন্তু কোরআন-হাদিসে যার সমর্থন নেই।
আবদুল হাই লাখনবি রহ. তাঁর ‘আল-আসারুল মারফুআ’ গ্রন্থে (পৃ. ৬৪-১০০) আশুরা সংক্রান্ত ভিত্তিহীন বর্ণনাগুলো একত্র করে পর্যালোচনা করেছেন। সেই তালিকায় এই কাহিনিও অন্তর্ভুক্ত।
আরও পড়ুন: মহররম মাসে করণীয় ও বর্জনীয়
তুরস্কের ‘আশুরে’ ও উপমহাদেশের খিচুড়ি
তুরস্কে ‘আশুরে’ (Aşure) নামে একটি জনপ্রিয় মিষ্টান্ন রয়েছে। এতে গম, শিম, ছোলা, শুকনো ফল ও নানা উপকরণ ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় লোকঐতিহ্যে একে নূহ (আ.)-এর নৌকার শেষ দিনের খাদ্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে এটি মূলত একটি সাংস্কৃতিক রীতি, যার শরিয়তভিত্তিক কোনো দলিল নেই।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে আশুরাকে কেন্দ্র করে খিচুড়ি রান্না বা বিতরণের রেওয়াজ গড়ে উঠেছে। কোথাও এটি ধর্মীয় আবেগের অংশ, কোথাও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তবে দুটি ক্ষেত্রেই শরিয়তের নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনার সম্পর্ক ইতিহাসবিদরা প্রমাণিত পাননি।
আশুরার দিনে খিচুড়ি রান্না: বিধান কী?
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে আশুরার দিনে খিচুড়ি বা অন্য যেকোনো বৈধ খাবার রান্না করা নিজে কোনো সমস্যা নয়। মানুষ স্বাভাবিক খাবার হিসেবে বা অতিথি আপ্যায়নের জন্য যা ইচ্ছা রান্না করতে পারে।
তবে আশুরার দিনে খিচুড়ি রান্নাকে সুন্নাহ, সওয়াবের নির্দিষ্ট আমল বা শরিয়ত-নির্ধারিত ইবাদত মনে করার পক্ষে কোনো সহিহ দলিল নেই।
আলেমরা তাই সুস্পষ্টভাবে বলেন- সাংস্কৃতিক রীতি হিসেবে খিচুড়ি রান্না করা এক বিষয়, আর একে ধর্মীয় আমল বা নূহ (আ.)-এর কিশতির ঘটনার স্মরণ বলে বিশ্বাস করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
আরও পড়ুন: নবীজি আশুরা পালন করতেন যেভাবে
আশুরার নিশ্চিত সুন্নাহ কী?
সহিহ হাদিসে আশুরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রমাণিত আমল হিসেবে রোজার কথা এসেছে।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। তারা জানাল, এ দিন আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। তখন নবী (স.) বললেন- ‘মুসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরাই বেশি হকদার।’ এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ৩৩৯৭; সহিহ মুসলিম: ১১৩০)
এছাড়া ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে রোজা রাখার কথাও হাদিসে এসেছে, যাতে ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য না হয়। (মুসনাদে আহমদ: ১/২৪১)
আর আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে নবী (স.) বলেছেন- ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোজার কারণে আল্লাহ তাআলা বিগত এক বছরের (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ১/৩৬৭)
অতএব, আশুরায় যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত, তা হলো রোজার ফজিলত ও সুন্নাহ। তাই প্রচলিত কাহিনির পেছনে না ছুটে, সহিহ দলিলভিত্তিক আমলের দিকে মনোযোগ দেওয়াই একজন মুসলমানের জন্য অধিক নিরাপদ ও অনুসরণযোগ্য পথ।
- ধর্মীয় যেকোনো বিষয়ে বিস্তারিত ফতোয়ার জন্য স্থানীয় যোগ্য আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করুন
তথ্যসূত্র: সুরা হুদ: ৪৪; সহিহ বুখারি: ৩৩৯৭; সহিহ মুসলিম: ১১৩০, ১/৩৬৭; মুসনাদে আহমদ: ৮৭১৭, ১/২৪১; আল-আসারুল মারফুআ, আবদুল হাই লাখনবি: পৃ. ৬৪-১০০




