‘আজ কত তারিখ?’ এই প্রশ্নের উত্তরে অনায়াসেই আমরা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের তারিখ বলে দিতে পারি। কিন্তু যদি জানতে চাওয়া হয়, আজ হিজরি কত তারিখ, তাহলে অধিকাংশ মুসলমানকেই থমকে যেতে হয়। অথচ একজন মুমিনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, আমল ও ধর্মীয় উপলক্ষ আবর্তিত হয় হিজরি ক্যালেন্ডারকে কেন্দ্র করে।
হিজরি মাস সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে আমরা অজান্তেই হাতছাড়া করছি বহু ফজিলতপূর্ণ আমল ও সওয়াবের সুযোগ।
বিজ্ঞাপন
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি। আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করার দিন থেকে আল্লাহর বিধানে তা নির্ধারিত। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত; এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন।’ (সুরা তাওবা: ৩৬)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামি ইবাদতের সময় নির্ধারণে হিজরি মাসই মূল ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে এই ক্যালেন্ডার সম্পর্কে উদাসীনতা আমাদের আমল ও ইবাদতের সঠিক সময় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। নিচে এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও আমলের কথা তুলে ধরা হলো, যেগুলো হিজরি তারিখ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সহজেই হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
১. ইদ্দত পালনের সঠিক সময় গণনা
ইসলামি শরিয়তে বিবাহবিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীদের জন্য ‘ইদ্দত’ পালন করা একটি ফরজ বিধান। পবিত্র কোরআনে বিধবাদের জন্য ‘চার মাস দশ দিন’ (সুরা বাকারা: ২৩৪) ইদ্দতের সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এই সময়সীমা হিজরি বা চান্দ্রমাসের হিসাব অনুযায়ী গণনা করতে হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসেবে গণনা করলে দিন-তারিখে তারতম্য হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা ইদ্দতের সঠিক পূর্ণতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই একজন মুসলিম নারীর জন্য ইদ্দতের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করতে হিজরি তারিখ সম্পর্কে সচেতন থাকা অপরিহার্য।
বিজ্ঞাপন
২. জাকাতের সঠিক হিসাব ও এক বছরের ঘাটতি
জাকাত ফরজ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া। ইসলামি শরিয়তে এই বছর গণনা করা হয় হিজরি সনের ভিত্তিতে, ইংরেজি সনের ভিত্তিতে নয়।
হিজরি বছর ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনের, আর ইংরেজি বছর ৩৬৫ দিনের। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১১ দিনের পার্থক্য তৈরি হয়। কেউ যদি নিয়মিত ইংরেজি তারিখ অনুযায়ী জাকাত আদায় করেন, তবে দীর্ঘ সময় পর তার জাকাত প্রদানে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব সৃষ্টি হতে পারে।
তাই জাকাতের হিসাবের ক্ষেত্রে হিজরি সন জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: মুসলিম ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হিজরি সন
৩. আইয়ামে বিজের রোজা
প্রতি হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখকে ‘আইয়ামে বিজ’ বলা হয়। এ তিন দিনের রোজা পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তুমি যদি মাসে তিন দিন রোজা রাখতে চাও, তাহলে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রাখো।’ (জামে তিরমিজি: ৭৬১)
হিজরি তারিখ না জানলে এই নিয়মিত সুন্নত আমল থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৪. জিলহজের প্রথম ১০ দিনের শ্রেষ্ঠ আমল
ইসলামি শরিয়তে বছরের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘এ দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় অন্যকোনো দিনের আমল নেই।’ (সহিহ বুখারি: ৯৬৯)
এ সময় নফল রোজা, জিকির, সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে ৯ জিলহজ তথা আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এ রোজা পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
আরও পড়ুন: জিলহজের প্রথম ১০ দিন: যে সময়ের আমল জিহাদের চেয়েও উত্তম
৫. সম্মানিত চার মাসে বিশেষ সতর্কতা
জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব- এই চারটি মাসকে কোরআনে ‘আশহুরে হুরুম’ বা সম্মানিত মাস বলা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘অতএব এই মাসগুলোতে তোমরা নিজেদের ওপর জুলুম করো না।’ (সুরা তাওবা: ৩৬)
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, এ মাসগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং নেক আমলের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কিন্তু হিজরি মাস সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেকেই বুঝতে পারেন না কখন এই সম্মানিত মাসগুলো চলছে।
৬. রমজানের মানসিক ও আমলগত প্রস্তুতি
রমজান হঠাৎ করে আসে না; এর প্রস্তুতি শুরু হয় রজব ও শাবান মাস থেকেই।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে রমজান ছাড়া অন্যকোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি, যতটা তিনি শাবান মাসে রাখতেন।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৬৯)
হিজরি মাসের খোঁজ না রাখলে রমজানের জন্য প্রয়োজনীয় আত্মিক ও আমলগত প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
৭. শাওয়ালের ছয় রোজা
রমজানের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখবে, সে যেন সারাবছর রোজা রাখল।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)
কিন্তু শাওয়াল মাসের হিসাব না রাখলে এই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমলও হাতছাড়া হতে পারে।
আরও পড়ুন: শাওয়াল শেষ হলেও কি ৬ রোজা রাখা যাবে?
৮. আশুরার রোজা
মহররম মাসের ১০ তারিখ ‘আশুরা’ নামে পরিচিত। এ দিনের রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
মহররম মাসের হিসাব না রাখলে এ মহান আমল থেকেও বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৯. লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান
রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (সহিহ বুখারি: ২০১৭)
হিজরি তারিখের প্রতি উদাসীনতা এই মহিমান্বিত রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি ও যথাযথ প্রস্তুতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
১০. নতুন চাঁদ দেখার সুন্নত
প্রতিটি নতুন হিজরি মাস শুরু হয় চাঁদ দেখার মাধ্যমে। নতুন চাঁদ দেখা এবং এ উপলক্ষে দোয়া পড়া রাসুলুল্লাহ (স.)-এর একটি সুন্নত।
তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) নতুন চাঁদ দেখলে দোয়া পড়তেন। (জামে তিরমিজি: ৩৪৫১)
হিজরি মাস সম্পর্কে সচেতনতা না থাকলে এই সুন্দর সুন্নতও হারিয়ে যেতে পারে।
১১. হজের নির্দিষ্ট সময় ও ইবাদতের সীমাবদ্ধতা
হজ একটি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ইবাদত, যা শাওয়াল, জিলকদ পেরিয়ে জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতেই আদায় করতে হয়। এই সময়ের বাইরে হজের কোনো আমল শরিয়তসম্মত নয়। তাই হজের সঠিক সময় জানতে হিজরি মাস সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
১২. মুসলিম পরিচয় ও ইতিহাসের সঙ্গে সংযোগ
হিজরি ক্যালেন্ডার শুধু তারিখ গণনার পদ্ধতি নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রমজান, হজ, আশুরা, ঈদ, হিজরত সবই হিজরি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত। হিজরি মাস ভুলে গেলে একজন মুসলমান ধীরে ধীরে নিজের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি করে ফেলে।
আমাদের করণীয়
প্রতিটি মুসলমানের উচিত ইংরেজি ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি হিজরি ক্যালেন্ডারের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া। ঘর, অফিস বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হিজরি ক্যালেন্ডার রাখা যেতে পারে। স্মার্টফোনে হিজরি তারিখ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা এবং দৈনন্দিন নোট বা পরিকল্পনায় হিজরি তারিখ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলাও উপকারী।
এ ছাড়া সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই হিজরি মাসগুলোর নাম, গুরুত্ব এবং সংশ্লিষ্ট ইবাদত সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
অতএব, একজন সচেতন মুসলমানের উচিত হিজরি তারিখকে নিজের ইবাদত, পরিচয় ও আখেরাতের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে দেখা। কারণ অনেক সময় একটি তারিখের খবর না থাকাই একজন মানুষকে বিরাট সওয়াব থেকে বঞ্চিত করে দিতে পারে।




