মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ডিজিটাল কনটেন্টে নারীর কণ্ঠস্বর: ইসলামি ফিকহের আলোকে একটি পর্যালোচনা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

শেয়ার করুন:

ডিজিটাল কনটেন্টে নারীর কণ্ঠস্বর: ইসলামি ফিকহের আলোকে একটি পর্যালোচনা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনেক নারী ঘরে বসে অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন। বিশেষ করে রান্নার রেসিপি বা হাতের কাজের ভিডিও তৈরি করে তারা পারিবারিক অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তবে এসব ভিডিও নির্মাণে শরিয়তের পর্দার বিধান রক্ষা করে কীভাবে কণ্ঠস্বর বা উপস্থাপনা করা যায়, তা নিয়ে অনেকের মনেই কৌতূহল রয়েছে। ইসলামি ফিকহ ও ফতোয়ার আলোকে এর একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান তুলে ধরা হলো

কণ্ঠস্বর সংরক্ষণে শরিয়তের নির্দেশনা

ইসলামি শরিয়তের বিধান হলো, অনিবার্য প্রয়োজন ছাড়া নারীর কণ্ঠস্বর যেন পরপুরুষ না শোনে। এ নির্দেশনা কেবল সাধারণ চলাফেরার ক্ষেত্রে নয়, ইবাদত-বন্দেগির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে লক্ষ রাখা হয়েছে।
ফকিহগণ কয়েকটি প্রসিদ্ধ উদাহরণ তুলে ধরেন। আজান দেওয়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল হওয়া সত্ত্বেও নারীর কণ্ঠ যেন পরপুরুষের কাছে না পৌঁছায়, সেজন্য নারীদের ওপর আজানের বিধান দেওয়া হয়নি; মুয়াজ্জিন হওয়ার জন্য পুরুষ হওয়া শর্ত করা হয়েছে। একইভাবে যেসব ফরজ নামাজে পুরুষরা উচ্চস্বরে কিরাত পড়েন, নারীদের সেখানে নিম্নস্বরে পড়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। হজ ও ওমরার তালবিয়াতেও পুরুষরা উচ্চস্বরে পড়লেও নারীরা নিম্নস্বরে পড়বেন।

আরও পড়ুন: ফেসবুক-ইউটিউব থেকে উপার্জন কি হালাল?

কোরআনের নির্দেশনা

প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ নয়। তবে সেক্ষেত্রেও কণ্ঠে কোমলতা ও আকর্ষণীয়তা পরিহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে পর পুরুষের সঙ্গে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুদ্ধ হয়। তোমরা সঙ্গত কথা বলবে।’ (সুরা আহজাব: ৩২)


বিজ্ঞাপন


আলেমদের ব্যাখ্যা

ইমাম আবুল আব্বাস আল-কুরতুবি (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, নারীর কণ্ঠকে আওরাত বললেই এর অর্থ এই নয় যে প্রয়োজনের সময় তার কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রয়োজনীয় কথোপকথন বৈধ। তবে কণ্ঠে টান দেওয়া, কোমলতা সৃষ্টি করা বা এমনভাবে কথা বলা যা পুরুষদের আকৃষ্ট করতে পারে- এগুলো বৈধ নয়। (ইমদাদুল ফাত্তাহ, পৃ. ২৬৯; আহকামুল কুরআন, জাস্সাস: ৩/৩৫৯)

আরও পড়ুন: শরিয়তসম্মত প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়ে ব্যবসার উদ্যোগ শায়খ আহমাদুল্লাহর

অনলাইন ভিডিওর ক্ষেত্রে বিধান

রান্নার রেসিপি বা অনুরূপ কনটেন্টে কণ্ঠ ব্যবহারের বিষয়ে আলেমগণ বলেন, এ ধরনের ভিডিওতে একটি অনির্দিষ্ট ও বৃহৎ পুরুষ দর্শকশ্রেণির কাছে কণ্ঠ পৌঁছে যায়, যা সাধারণ ব্যক্তিগত কথোপকথনের চেয়ে ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করে। তা ছাড়া বাণিজ্যিক কনটেন্টে কণ্ঠের উপস্থাপনা স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় রাখার প্রবণতা থাকে, যা শরিয়তের সতর্কতার পরিপন্থী।
এ কারণে ফকিহগণের পরামর্শ হলো, এ ধরনের ভিডিওতে সরাসরি নিজের কণ্ঠ ব্যবহার না করে বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করা। যেমন স্বামী, ভাই বা অন্যকোনো মাহরাম পুরুষের কণ্ঠ ব্যবহার করা, অথবা লিখিত বিবরণ বা সাবটাইটেলের মাধ্যমে তথ্য উপস্থাপন করা।

মোটকথা, ইসলাম নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করে না। তবে সেই কর্মকাণ্ড যেন শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে থাকে, সেটি নিশ্চিত করা প্রতিটি মুসলিম নারীর দায়িত্ব। অনলাইনে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে কণ্ঠ ব্যবহারে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করলে জীবিকার প্রয়োজনও পূরণ হয়, আবার শরিয়তের নির্দেশনার প্রতি সর্বোচ্চ সতর্কতা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখাও সম্ভব হয়।

সূত্র: সুরা আহজাব: ৩২; ইমদাদুল ফাত্তাহ পৃ. ২৬৯; আহকামুল কুরআন, জাস্সাস: ৩/৩৫৯; শরহু মুখতাসারিত তাহাবি, জাস্সাস: ১/৫৬৩; উমদাতুল কারি: ৭/২৭৯; আলকাফি শরহুল ওয়াফি: ২/৫২৯

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর