হজ এমন এক দীর্ঘ ইবাদত, যার প্রতিটি পদক্ষেপে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মাঝে রয়েছে বিশেষ বরকত। অনেক হাজি ফরজ ও ওয়াজিব পালনে অত্যন্ত সচেতন থাকলেও সফরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ অলক্ষ্যে বাদ পড়ে যায়। হজকে আরও পরিপূর্ণ ও কবুল হওয়ার উপযোগী করতে এই সুন্নাহগুলো পালন করা জরুরি-
১. বাসা থেকে বের হওয়ার আগে দুই রাকাত নামাজ
সফর শুরু করার আগে নিজের ঘরে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা একটি চমৎকার সুন্নাহ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দুই রাকাত নামাজ আদায় করা তোমাকে বাইরের অনিষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবে।’ অনেক হাজি ব্যস্ততার কারণে এই বরকতময় আমলটি এড়িয়ে যান।
২. বিদায়বেলায় নির্দিষ্ট দোয়া বিনিময়
হজে যাওয়ার সময় আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে বিদায় নেওয়া উচিত। সুন্নাহ হলো- বিদায় গ্রহণকারী ব্যক্তি হাজির উদ্দেশ্যে বলবে- ‘আস্তাউদিউল্লাহা দিনাকা ওয়া আমানাতাকা ওয়া খাওয়াতিমা আমালিকা’ (আমি তোমার দ্বীন, আমানত ও শেষ আমলগুলো আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলাম)। এটি একটি অবহেলিত আমল যা বর্তমানে খুব কম দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. তিন বা ততোধিক ব্যক্তি থাকলে একজনকে ‘আমির’ বানানো
হজ কাফেলায় যখন কয়েকজন একসাথে সফর করেন, তখন একজনকে তাদের মধ্য থেকে ‘আমির’ বা দলনেতা নির্ধারণ করা সুন্নাহ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যখন তিনজন ব্যক্তি সফরে বের হয়, তখন তারা যেন তাদের একজনকে আমির নির্ধারণ করে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৮) এতে সফরের শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং বরকত বৃদ্ধি পায়।
৪. ইহরাম বাঁধার আগে সুগন্ধি ব্যবহার ও পরিচ্ছন্নতা
ইহরাম পরিধানের আগে গোসল করা, নখ ও চুল পরিষ্কার করা এবং শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাহ। ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও তার ঠিক আগে শরীরে আতর লাগানো উত্তম, যাতে ইহরামের কাপড়ে তার ঘ্রাণ লেগে থাকে। রাসুলুল্লাহ (স.) ইহরামের আগে তাঁর পবিত্র শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। (সহিহ বুখারি: ১৫৩৯)
৫. উঁচুতে ওঠার সময় ‘তাকবির’ ও নিচে নামার সময় ‘তাসবিহ’
বিমানে ওঠা বা বাসে করে পাহাড়ি পথ অতিক্রম করার সময় এটি একটি বিশেষ সুন্নাহ। জাবের (রা.) বলেন, ‘সফরে যখন আমরা উঁচুতে উঠতাম তখন ‘আল্লাহু আকবার’ (তাকবির) বলতাম এবং যখন নিচে নামতাম তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ (তাসবিহ) বলতাম।’ (সহিহ বুখারি: ২৯৯৩) আজকের যানবাহনে ভ্রমণের সময়ও এই আমলটি অনায়াসেই করা যায়।
আরও পড়ুন: হজের সফরে মক্কা পৌঁছা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু দোয়া
৬. অধিক পরিমাণে তালবিয়া পাঠ করা
‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’ এই তালবিয়া হজের প্রাণ। ইহরাম বাঁধার পর থেকে শুরু করে হজের প্রতিটি ধাপে রাসুলুল্লাহ (স.) অধিক পরিমাণে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করতেন। অনেক হাজি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে এটি পড়তে ভুলে যান বা লজ্জা বোধ করেন, যা সুন্নাহর পরিপন্থী।
৭. সহযাত্রীদের সেবা ও ধৈর্য ধারণ
সফরে সহযাত্রীদের সাহায্য-সহযোগিতা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, যা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পবিত্র আদর্শের অন্তর্ভুক্ত। হজের ভিড় ও প্রতিকূল পরিবেশে বিরক্তি বা রাগ প্রকাশ না করে অন্য হাজিদের ল্যাগেজ টানা বা পথ দেখানোর মতো ছোট সেবাগুলো হজকে ‘মাবরুর’ বা কবুল করতে সাহায্য করে।
হজের ফরজ ও ওয়াজিব পালনের পাশাপাশি এই ছোট ছোট সুন্নাহগুলোই একজন হাজিকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আদর্শের আরও কাছে নিয়ে যায়। আসন্ন হজের সফরে এই অবহেলিত সুন্নাহগুলো পালন করে আমরা আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষার ইবাদতটিকে আরও অর্থবহ ও বরকতময় করে তুলতে পারি।




