বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

ওহুদ যুদ্ধ: ত্যাগ ও ঈমানি পরীক্ষার এক অমর ইতিহাস

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ মার্চ ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

শেয়ার করুন:

ওহুদ যুদ্ধ: ত্যাগ ও ধৈর্যের এক অমর ইতিহাস

পবিত্র শাওয়াল মাস ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর আত্মত্যাগ ও পরীক্ষার মাস। হিজরি ৩ সনের এই মাসে মদিনার উত্তরে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ওহুদ প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল ইসলামের দ্বিতীয় বড় যুদ্ধ ‘ওহুদ যুদ্ধ’। বদর যুদ্ধের ঠিক এক বছর পর মক্কার কুরাইশদের প্রতিশোধপরায়ণ লালসা থেকে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ওহুদ যুদ্ধ ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং নেতার প্রতি আনুগত্যের এক অক্ষয় পাঠ।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও প্রস্তুতি

বদর যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয় মক্কার কাফেররা মেনে নিতে পারেনি। আবু সুফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলার লভ্যাংশের টাকা দিয়ে তারা যুদ্ধের বিশাল প্রস্তুতি শুরু করে। হাবশি বর্শা নিক্ষেপকারী ওয়াহশিকে নিযুক্ত করা হয় রাসুলুল্লাহ (স.)-এর চাচা আমির হামজাকে হত্যার মিশনে। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ৩০০০ যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী মদিনার দিকে রওনা হয়। এই বাহিনীতে ছিল ২০০ ঘোড়া, ৩০০০ উট এবং ৭০০ বর্মধারী সেনা। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে সেনাদের মনোবল বাড়াতে তারা সঙ্গে নিয়েছিল নারীদের এক বিশেষ দল।

আরও পড়ুন: বদর যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বিজয় ও শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ

মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস ও সংঘাতের শুরু

প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় রাসুলুল্লাহ (স.) ১০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে রওনা হন। তিনি বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন-
১. মুহাজির বাহিনী: নেতৃত্বে ছিলেন মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.)।
২. আউস বাহিনী: নেতৃত্বে ছিলেন উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.)।
৩. খাজরাজ বাহিনী: নেতৃত্বে ছিলেন হুবাব ইবনে মুনজির (রা.)।


বিজ্ঞাপন


যাত্রাপথে 'শাওত' নামক স্থানে পৌঁছে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার ৩০০ অনুসারী নিয়ে দলত্যাগ করলে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৭০০-তে। পথপ্রদর্শক আবু খাইসামার মাধ্যমে ভিন্ন পথে অত্যন্ত কৌশলে মুসলিম বাহিনী ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নেয়। যুদ্ধের শুরুতে হযরত আলী (রা.)-এর হাতে কুরাইশদের পতাকাধারী তালহা ইবনে আবি তালহা নিহত হলে কাফেররা রণে ভঙ্গ দিয়ে পালাতে শুরু করে।

আরও পড়ুন: তাবুক যুদ্ধে আবু খায়সামা (রা.)-এর নবীপ্রেমের ঘটনা

জাবালে রুমা ও একটি ঐতিহাসিক ভুল

ওহুদের প্রান্তরে ‘জাবালে রুমা’ বা রুমা পাহাড়ে রাসুলুল্লাহ (স.) ৫০ জন তিরন্দাজকে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর নেতৃত্বে মোতায়েন করেন। তাদের কঠোর নির্দেশ ছিল- ‘আমাদের জয় বা পরাজয় যা-ই হোক, তোমরা এই স্থান ত্যাগ করবে না।’ কিন্তু শত্রু বাহিনীকে পালাতে দেখে এবং জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ৪০ জন তিরন্দাজ গনিমতের মাল সংগ্রহের জন্য পাহাড়ের গিরিপথ ত্যাগ করেন। এই সুযোগে খালিদ বিন ওয়ালিদ (যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি) পেছন থেকে আক্রমণ করেন এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়।

ওহুদ প্রান্তরের অমর শহীদান

ওহুদ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন-
হজরত হামজা (রা.): রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রিয় চাচা ও শ্রেষ্ঠ বীর যোদ্ধা, যাঁকে ‘সাইয়্যেদুশ শোহাদা’ বলা হয়।
হজরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.): ইসলামের প্রথম দূত ও পতাকাবাহী। চেহারায় রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় তাঁর শাহাদাতের পর নবীজি নিহত হয়েছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল।
হজরত হানজালা (রা.): যুদ্ধের ডাক শুনে নববধূর সান্নিধ্য ত্যাগ করে অপবিত্র অবস্থায় যুদ্ধে যোগ দেন। ফেরেশতারা তাঁকে গোসল করিয়েছিলেন বলে তাঁকে ‘গাসিলুল মালাইকা’ বলা হয়।
হজরত উসাইরাম (রা.): যিনি এক সিজদাহ না দিয়েও জান্নাতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
হজরত আমর ইবনুল জামুহ (রা.): একজন শারীরিকভাবে অক্ষম (লেংড়া) সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও জান্নাতে বিচরণ করার আকুতি নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন।

আরও পড়ুন: যুদ্ধক্ষেত্রে যাদের আঘাত করা ইসলামে নিষিদ্ধ

আবু সুফিয়ান ও হজরত উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক বাদানুবাদ

যুদ্ধ শেষে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান দম্ভভরে যখন নিজের মূর্তির প্রশংসা করছিল এবং মুসলিমদের মৃত বলে উপহাস করছিল, তখন রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নির্দেশে হজরত উমর (রা.) বজ্রকণ্ঠে জবাব দেন। আবু সুফিয়ান যখন বলল, ‘আমাদের আছে উযযা (মূর্তি), তোমাদের কোনো উযযা নেই।’ তখন নবীজি (স.) শিখিয়ে দিলেন এই বলে জবাব দিতে- ‘আল্লাহু মাওলানা, ওয়ালা মাওলানা লাকুম’ (আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, আর তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই)।

কোরআনের বিশ্লেষণ ও শিক্ষা

সুরা আলে ইমরানের ১২১ থেকে ১৬০ নম্বর আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলা ওহুদ যুদ্ধের ঘটনা ও এর গভীর শিক্ষা বর্ণনা করেছেন। ওহুদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো নেতার নির্দেশ অমান্য করার ভয়াবহ পরিণাম। এটি আমাদের শেখায় যে, একতা ও আনুগত্য ছাড়া বিজয় অসম্ভব। ওহুদ প্রান্তরের এই রক্তঝরা ইতিহাস মুমিনদের ধৈর্য ও দৃঢ়তার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পথ দেখায়।

ওহুদ যুদ্ধ ছিল ঈমানি দৃঢ়তা ও নিঃশর্ত আনুগত্যের এক বাস্তব পাঠশালা। ওহুদ পাহাড়ের নিস্তব্ধ প্রান্তর আজও সাক্ষ্য দেয় যে, পার্থিব প্রাপ্তির চেয়ে আল্লাহর নির্দেশ মান্য করাই মুমিনের প্রকৃত সফলতা।

সূত্র: সুরা আলে ইমরান; আর-রাহিকুল মাখতুম; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; সহিহ বুখারি ও মুসলিম (মাগাজি অধ্যায়)

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর