বিদায় নিতে চলেছে রহমত মাগফেরাতের মাস পবিত্র রমজান। মুমিনের হৃদয়ে এখন একদিকে যেমন মাসজুড়ে সিয়াম সাধনার তৃপ্তি, অন্যদিকে প্রিয় মাসটিকে হারানোর বিচ্ছেদ-বেদনা। তবে এই মুহূর্তে মুমিনের সবচেয়ে বড় ভাবনা হলো- মাসব্যাপী আমাদের ইবাদতগুলো কি আল্লাহর দরবারে কবুল হলো? দ্বিতীয় হিজরি মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানরা প্রথম ঈদুল ফিতর পালন করেন। রাসুল (স.) ও তাঁর সাহাবিদের জীবনে ঈদ ছিল আধ্যাত্মিকতা, ভ্রাতৃত্ব এবং পবিত্র আনন্দের এক অনন্য সমন্বয়। হাদিস ও জীবনীগ্রন্থের আলোকে তাঁদের ঈদ উদযাপনের বিশেষ দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
১. পবিত্রতা ও সর্বোত্তম পোশাক পরিধান
ঈদের সকালে রাসুল (স.) অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গোসল করতেন। হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (সুনান বায়হাকি: ৫৯২০) রাসুল (স.) তাঁর কাছে থাকা সবচেয়ে সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাকটি পরিধান করতেন। এটি ছিল আল্লাহর নেয়ামতের প্রকাশ। কারণ রাসুল (স.) বলেতেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর তাঁর প্রদত্ত নেয়ামতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৮১৯)
২. মিষ্টিমুখ করে ঈদগাহে যাত্রা
ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে ঈদগাহে না যাওয়া রাসুল (স.)-এর বিশেষ সুন্নাহ। হজরত বুরাইদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (স.) ঈদুল ফিতরের দিনে না খেয়ে বের হতেন না। সাধারণত তিনি বিজোড় সংখ্যায় খেজুর খেয়ে বের হতেন। এটি ছিল মাসব্যাপী রোজা শেষ হওয়ার এক প্রতীকী ঘোষণা।
৩. ফিতরা ও দান-সদকা নিশ্চিত করা
রাসুল (স.) ঈদের নামাজের আগেই গরিব-দুঃখীদের হক ‘সদকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা আদায় করার নির্দেশ দিতেন। তিনি চাইতেন, ঈদের আনন্দ যেন কেবল বিত্তবানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষ যেন এই খুশিতে শামিল হতে পারে।
৪. হেঁটে যাওয়া ও যাতায়াতের পথ পরিবর্তন
হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘সুন্নত হলো ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া।’ (তিরমিজি) আবু রাফি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) পদব্রজে ঈদগাহে আসতেন। (ইবনে মাজাহ: ১২৯৭) এছাড়া রাসুল (স.) ঈদগাহে যাওয়ার সময় যে পথ ব্যবহার করতেন, ফেরার সময় সেই পথ দিয়ে না এসে ভিন্ন পথ ব্যবহার করতেন। (সহিহ বুখারি: ৯৮৬) এর ফলে অধিক সংখ্যক মানুষের সাথে সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময় করা সম্ভব হতো। পথে তিনি উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করতেন।
৫. ঈদের নামাজ ও খুতবা
রাসুল (স.) লোকালয় থেকে দূরে খোলা ময়দানে (ঈদগাহ) ঈদের নামাজ পড়তেন। তিনি দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন (সহিহ বুখারি: ৯৮৯) নামাজ শেষে তিনি খুতবা প্রদান করতেন। ঈদের খুতবা শোনা ওয়াজিব। (মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক: ৫৬৪২)
৬. আনন্দ ও সুস্থ বিনোদন
ইসলামি শরিয়তের গণ্ডির ভেতরে থেকে আনন্দ প্রকাশকে রাসুল (স.) সমর্থন করতেন। এক ঈদের দিনে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর ঘরে দুটি ছোট মেয়ে ঐতিহাসিক বুয়াস যুদ্ধের বীরত্বগাথা নিয়ে গান গাচ্ছিল। হজরত আবু বকর (রা.) এসে তাদের ধমক দিলে রাসুল (স.) বললেন, ‘হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।’ (সহিহ বুখারি: ৯৫২) এছাড়াও আবিসিনিয়ার যুবকদের লাঠিখেলা রাসুল (স.) নিজে দাঁড়িয়ে আয়েশা (রা.)-কে দেখিয়েছিলেন।
৭. মানবিকতা ও এতিমদের প্রতি মমতা
রাসুল (স.)-এর ঈদের আনন্দ ছিল সর্বজনীন। তিনি সবসময় এতিম, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি বিশেষ মমতা প্রদর্শন করতেন। ঈদের দিনে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের যেন সর্বোত্তম খাবার ও পোশাক নিশ্চিত হয়, সেদিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল। তাঁর শিক্ষা ছিল- মানুষের সেবা ও ভ্রাতৃত্বই উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা।
৮. সাহাবিদের ঈদ ও আমল কবুলের চিন্তা
সাহাবিগণ একে অপরকে ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনার পক্ষ থেকে নেক আমলগুলো কবুল করুন) বলে শুভেচ্ছা জানাতেন। তবে আনন্দের পাশাপাশি তাঁদের মনে আমল কবুল না হওয়ার ভয়ও কাজ করত। হজরত ওমর (রা.) ঈদের দিনেও অঝোরে কাঁদতেন এবং বলতেন, ‘রোজা শেষ হয়ে আজ ঈদের দিন, কিন্তু আমি এখনও জানি না আমার গুনাহ মাফ হয়েছে কি না। মাফ না হলে আমি কীভাবে নিশ্চিত হয়ে ঈদের আনন্দ করি?’
রাসুল (স.)-এর ঈদ ছিল কৃতজ্ঞতা, সংযম ও সহমর্মিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করলে আমাদের ঈদও হতে পারে অর্থবহ, আধ্যাত্মিক ও কল্যাণময়। প্রকৃতপক্ষে, ঈদের প্রকৃত শিক্ষা নিহিত রয়েছে তাকওয়া অর্জন, সামাজিক সংহতি এবং আর্তমানবতার সেবায়।

