মানব ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ দিন ছিল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইন্তেকালের দিনটি। প্রিয়নবীর চিরবিদায়ের খবরে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা মদিনা। শোকের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, অনেক বড় বড় সাহাবিও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ইসলামের সেই চরম সংকটের মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তাঁর অসীম সাহসিকতা, পাহাড়সম দৃঢ়তা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তগুলো সেদিন মুসলিম উম্মাহকে এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল।
শোকাতুর মদিনা ও আবু বকরের (রা.) অটল বিশ্বাস
রাসুল (স.)-এর ওফাতের খবর শুনে হজরত ওমর (রা.)-এর মতো বীর সাহাবিও আবেগাপ্লুত হয়ে কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে ঘোষণা করেন- ‘যে বলবে রাসুল (সা.) মারা গেছেন, আমি তার গর্দান নেব!’ ঠিক সেই মুহূর্তেই আবু বকর (রা.) শান্ত অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘যারা মুহাম্মদের ইবাদত করতে তারা জেনে রাখো, মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু যারা আল্লাহর ইবাদত করো তারা জেনে রাখো- আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।’
এরপর তিনি সুরা আলে ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াতটি পাঠ করেন, যেখানে বলা হয়েছে- মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল ছাড়া আর কিছু নন; তাঁর আগেও বহু রাসুল গত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন, তবে কি তোমরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে? আবু বকর (রা.)-এর এই কালজয়ী ভাষণে সাহাবিদের সম্বিত ফিরে আসে এবং পরিস্থিতি শান্ত হয়।
আরও পড়ুন: যাঁকে দেখলেই শয়তান পালাত: হজরত ওমরের ৪ শক্তিশালী গুণ
ক্ষমতার মোহহীন এক রাষ্ট্রনায়কের আদর্শ
খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আবু বকর (রা.) যে নীতিনির্ধারণী ভাষণ দিয়েছিলেন, তা আজীবন বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের জন্য এক অনন্য সংবিধান হয়ে থাকবে। তিনি বলেছিলেন- ‘আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে খলিফা নিযুক্ত করা হয়েছে... আমি একজন সাধারণ মানুষ। আপনারা যদি দেখেন আমি সঠিক কাজ করছি, তবে আমাকে সহায়তা করবেন। আর যদি দেখেন আমি বিপথগামী হচ্ছি, তবে আমাকে সতর্ক করে দেবেন।’
একজন শাসক হয়েও জনগণের কাছে জবাবদিহিতার এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, শাসনের ভিত্তি হবে ন্যায়বিচার এবং রাসুলের (স.) আদর্শ।
বিদ্রোহ দমন ও আপসহীন নেতৃত্ব
রাসুল (স.)-এর ইন্তেকালের পর আরব উপদ্বীপের চারদিকে বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কিছু ভণ্ড নিজেকে নবী দাবি করে বসে, আবার অনেক গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে (মুরতাদ হয়ে) জাকাত দিতে অস্বীকার করে। এক কঠিন পরিস্থিতি! একদিকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অন্যদিকে বহিঃশত্রুর ভয়।
পরামর্শ সভার অনেকেই তখন নমনীয় হওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু আবু বকর (রা.) অটল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন- ‘রাসুল (স.)-এর যুগে উটের যে বাচ্চাটির জাকাত দেওয়া হতো, এখন কেউ তা দিতে অস্বীকার করলে আমি তার বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করব।’ তাঁর এই কঠোর অবস্থানের কারণেই ইসলামের স্তম্ভগুলো সংরক্ষিত হয়েছিল।
আরও পড়ুন: নবীজির নির্দেশ পালনে সাহাবিদের ব্যাকুলতা
উসামার বাহিনীর যাত্রা: এক ঐতিহাসিক জেদ
রাসুল (স.) ইন্তেকালের ঠিক আগে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী সিরিয়ার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করেছিলেন। উত্তাল পরিস্থিতিতে অনেকেই এই বাহিনীকে মদিনার সুরক্ষায় রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু বকর (রা.) বললেন, ‘রাসুল (স.) যে ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছেন, আবু বকর তা নামিয়ে রাখতে পারে না।’ প্রাণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি নবীজির নির্দেশ পালন করেন, যা শত্রুপক্ষের মনে ভীতির সৃষ্টি করে এবং ইসলামের শক্তি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, আল্লাহর অশেষ রহমতের পর আবু বকর (রা.) যদি সেদিন এমন ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা না দেখাতেন, তবে মুসলিম জাতির ইতিহাস হয়তো আজ অন্যভাবে লেখা হতো। বিশৃঙ্খল সমাজকে শৃঙ্খলার সুতোয় গেঁথে তিনি প্রমাণ করেছেন- নেতৃত্বের আসল শক্তি হলো আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা এবং সত্যের পথে আপসহীনতা। ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে তাঁর এই অবদান কেয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
(তথ্যসূত্র: আসহাবে রাসুলের জীবনকথা)

