শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬, ঢাকা

শুক্রবার হওয়ায় এবার কি ‘আকবরি হজ’ হচ্ছে?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ জুলাই ২০২২, ০৮:৪৩ এএম

শেয়ার করুন:

শুক্রবার হওয়ায় এবার কি ‘আকবরি হজ’ হচ্ছে?

এবারের হজ অনুষ্ঠিত হবে ৮ জুলাই, শুক্রবার। এদিন বিশ্বের ১০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান মক্কা থেকে ১৫ কিলোমিটার নিকটবর্তী আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন। তাঁদের ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হবে আরাফার ময়দান। নবী কারিম (স.) ইরশাদ করেন, ‘আরাফার ময়দানে অবস্থান করাই হজ।’ (সুনান নাসায়ি: ৩০৪৪)

আরাফার দিনের সঙ্গে শুক্রবার মিলে গেলে বা জুমাবারে আরাফার দিন হলে সেই হজের আলাদা ফজিলত রয়েছে বলে একটি ধারণা প্রচলিত আছে, যাকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করে থাকেন আলেমরা। বরং যে বর্ণনার আলোকে এ কথা বলা হয়, সেটি জাল ও ভিত্তিহীন। সেখানে বলা হয়েছে, আরাফার দিন জুমার দিনের সঙ্গে মিলে গেলে তা ৭০টি হজের চেয়েও উত্তম। (সিলসিলা জয়িফা: ১১৯৩)

সাহেবে তুহফা হুঁশিয়ার করে বলেন, শুক্রবারে হজ হলে তাকে ‘আকবরি হজ’ বলে সমাজে যে ধারণা প্রচলিত আছে, তা ভিত্তিহীন’ (তুহফাতুল আহওয়াজি: ৪/২৭ হা/৯৫৮-এর ব্যাখ্যা)। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘এটি একটি বাতিল কথা, এর কোনো ভিত্তি নেই। রাসুলুল্লাহ (স.), সাহাবা-তাবেয়িন কারও থেকেই এ ধরনের কথা প্রমাণিত নয়।’ (ফয়জুল কাদির: ২/২৮)

সুরা তাওবায় উল্লেখিত ‘হজে আকবর’-এর অর্থ কারো মতে আরাফার দিন, আবার অধিকাংশের মতে, এর অর্থ কোরবানির দিন। কেননা রাসুল (স.) হজ পালনকালে কোরবানির দিনকে ‘হজে আকবর’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। (বুখারি:১৭৪২, আবু দাউদ: ১৯৪৫, মেশকাত: ২৬৭০)

এবারের হজ শুক্রবারের দিন হওয়ায় একে ঘিরে বেশ কিছু ফজিলতের বিষয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচার করা হচ্ছে, ‘দীর্ঘ ২৮০ বছর পর এবার হজ শুক্রবারে পড়েছে, যা হজে আকবর।’ এই বক্তব্যের সবটাই অসত্য। কারণ সর্বশেষ ২০১৪ সালের (৩ অক্টোবর) হজ শুক্রবারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়া ২০০৯ সালের ২৭ নভেম্বর এবং ২০০২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হজও ছিল শুক্রবারে।

‘৭০ বছর হজের চেয়ে উত্তম’ হাদিসটি বাতিল হওয়ায় জুমার দিনে আরাফার যে কোনো মর্যাদা নেই—এমনটিও নয়। শায়খ উসাইমিন (রহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- এ ব্যাপারে নবী (স.) থেকে কিছু বর্ণিত আছে কিনা? উত্তরে তিনি বলেন, জুমার দিন হজ হওয়ার ফজিলত সম্পর্কে নবী (স.) হতে কিছু বর্ণিত নেই। তবে আলেমগণ বলেন, জুমার দিনে হজ্জ হওয়াটা উত্তম। 


বিজ্ঞাপন


কেননা এই হজ নবী (স.)-এর হজের সঙ্গে মিলে যায়। কারণ নবীজির আরাফায় অবস্থান ছিল জুমার দিনে। তাছাড়া জুমার দিনে এমন একটি সময় থাকে, যখন কোনো মুসলিম বান্দা দাঁড়িয়ে নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে দোয়া করলে সেটি কবুল হওয়ার অধিক উপযুক্ত। এছাড়া আরাফার দিন ঈদ এবং জুমার দিনও ঈদ; সুতরাং দুই ঈদ একত্র হওয়া কল্যাণকর। পক্ষান্তরে যা মশহুর হয়ে গেছে যে, জুমার দিনে হজ ৭০টি হজের সমান—গাইরে সহিহ (আললিকা আশশাহরি: ৩৪/১৮)

সঠিক বক্তব্য হচ্ছে, দিনের মধ্যে উত্তম হচ্ছে জুমার দিন, আরাফার দিন ও কোরবানির দিন, আর রাতের মধ্যে লাইলাতুল কদর ও জুমার রাত। এ কারণে আরাফার দিনের সঙ্গে জুমার দিন মিলে গেলে মর্যাদাপূর্ণ হয়ে যায়। ইবনুল কাইয়িম (রহ) জুমার দিনে হজ হওয়ার ১০টি মর্যাদা উল্লেখ করেছেন। যেমন

১) উত্তম দুটি দিন একত্রিত হওয়া

২) এটি এমন দিন, যেদিনে এমন একটি সময় আছে যে সময়ে দোয়া কবুল হওয়া সুনিশ্চিত। অধিকাংশ আলেমের মতে সে সময়টি আসরের পর। এ সময়ে আরাফাবাসী দোয়া-রোনাজারিতে মশগুল থাকেন।

৩) নবী (স.)-এর আরাফায় অবস্থানের সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়া।

৪) খুতবা শোনা ও জুমার নামাজ আদায় করার জন্য পৃথিবীর সব প্রান্তের মুসলমানের নিজ নিজ মসজিদে একত্রিত হওয়া, একইসময়ে আরাফাতে একত্রিত হওয়া। এভাবে বিশ্বমুসলিমের একসঙ্গে দোয়ার মাধ্যমে এমন কিছু অর্জিত হয়, যা অন্য মাধ্যমে অর্জিত হয় না।

৫) জুমার দিন ঈদের দিন। আর আরাফার দিনও ঈদ হওয়ায় এদিন আরাফাবাসীর জন্য রোজা রাখা মাকরুহ।...

৬) এই দিনে মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহর দেয়া শরিয়ত ও নেয়ামত পূর্ণ করার দিন। সহিহ বুখারিতে তারেক বিন শিহাব হতে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ইহুদি ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর নিকট এসে বলল— হে আমিরুল মুমিনিন, আপনারা আপনাদের ধর্মগ্রন্থে এমন একটি আয়াত পড়েন যদি সে আয়াতটি আমাদের ইহুদিদের ওপর নাজিল হত আর আমরা জানতাম কোনদিন এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে, তাহলে আমরা সেদিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতাম। তিনি বললেন, কোন আয়াতটি? ইহুদি বলল— ‘(অর্থ) আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। (সুরা মায়েদা: ৩) তখন ওমর (রা.) বলেন, নিশ্চয় আমি জানি, যেদিন ও যে স্থানে এ আয়াতটি নাজিল হয়েছে। এটি আরাফার ময়দানে শুক্রবারে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর নাজিল হয়েছে। তখন আমরা তাঁর সঙ্গে আরাফার ময়দানে অবস্থান করছিলাম।

৭) এটি কেয়ামতের দিনের মহা-সম্মেলনের সঙ্গে মিলযুক্ত। কারণ কেয়ামত শুক্রবারে সংঘটিত হবে। নবী (স.) বলেছেন- ‘সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমার দিন। এদিন আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, এই দিনে তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এবং এই দিনে কেয়ামত সংঘটিত হবে। এই দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যদি কোনো মুসলিম বান্দা সে সময়ে আল্লাহর কাছে ভালো কিছু চাইতে পারে, আল্লাহ তাকে তা দান করেন।’

৮) জুমার দিনে ও রাতে মুসলমানদের আমল অন্য দিনের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। এমনকি পাপীরাও জুমার দিন ও রাতকে সম্মান করে থাকে এবং মনে করে থাকে এই দিনে যে ব্যক্তি গুনাহ করার স্পর্ধা দেখায়, আল্লাহ তাকে অবিলম্বে শাস্তি দেন; দেরি করেন না। এটি তাদের নিকট স্বতঃসিদ্ধ। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তারা তা জেনেছে। তা এ দিনের মহান মর্যাদা, সম্মান ও আল্লাহর নিকট মনোনীত দিন হওয়ার কারণে। কোনো সন্দেহ নেই এই দিনে আরাফায় অবস্থান নিতে পারার মর্যাদা অনেক বেশি।

৯) জুমার দিন জান্নাতে কিছু বাড়তি পাওয়ার দিন...। এর সঙ্গে আরাফার দিন যদি মিলিত হয়, তাহলে এর বাড়তি মর্যাদা থাকাটাই স্বাভাবিক।

১০) আরাফার দিন বিকেল বেলা আল্লাহ তাআলা আরাফাবাসীর নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের কাছে তাদেরকে নিয়ে গর্ব করেন...

এগুলো ছাড়াও আরো কারণ আছে যা জুমার দিনে আরাফায় অবস্থানকে বিশেষত্ব দিচ্ছে। কিন্তু মানুষের মুখে যা চালু আছে যে, জুমার দিনের হজ ৭২টি হজের সমান, তা বাতিল। নবী (স.) থেকে অথবা কোনো সাহাবি কিংবা কোনো তাবেয়ি থেকে এ ধরণের কোনো বর্ণনার ভিত্তি নেই। (জাদুল মাআদ: ১/৬০-৬৫ থেকে সংক্ষেপিত)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সত্যকে সত্য বলার এবং হাদিসের নামে ভুল-ভ্রান্তি ছড়ানো থেকে হেফাজত করুন। আমিন। 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর