সাধারণত সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার নাম সিয়াম বা রোজা। তবে, এটাই সিয়ামের শেষ কথা নয়। এর তাৎপর্য অনেক গভীর ও বিস্তৃত।
রোজার পূর্ণতার প্রধান উপাদান হচ্ছে পাপাচার থেকে বিরত থাকা। এ প্রসঙ্গে মহানবি (স.) ইরশাদ করেন, রোজা রেখে যে ব্যক্তি মিথ্যাচার ও অন্যায় আচরণ পরিহার করল না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ এমন রোজা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় নয়।
বিজ্ঞাপন
রমজানে আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে যে মজবুত সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তার মূলে রয়েছে পবিত্র কোরআন। কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে রমজানে, তাই এই মাসে অধিকহারে কোরআনচর্চা, তিলাওয়াতের গুরুত্ব অপরিসীম।
এরপরে দ্বীনি কাজে তানাফুস (নেক কাজের প্রতিযোগিতা) খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণীয়। যেকোনো নফল ইবাদত, জিকির-আজকার, দান-সদকা, ভালো ব্যবহার, ক্ষমাশীলতা, উদারতাসহ প্রত্যেকটি নেক আমলে তানাফুস অফুরন্ত রহমত ও বরকতের কারণ।
কীভাবে রোজা রাখলে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভ হবে—সেবিষয়ে ইমাম গাজালি (রহ)-এর ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে রোজার তিনটি স্তরের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, প্রতিটি স্তরের মর্যাদায় রয়েছে তারতম্য। স্তরগুলো হলো ১. সাধারণের রোজা, ২. বিশেষ শ্রেণির রোজা, ৩. অতি বিশেষ শ্রেণির রোজা।
১) সাধারণের রোজা হলো পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থাকা। ২) বিশেষ শ্রেণির রোজা হলো পেট ও লজ্জাস্থানের চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পা অর্থাৎ তার সব অঙ্গ পাপমুক্ত রাখা। ৩) অতি বিশেষ শ্রেণির রোজা হলো নিজের অন্তরকে দুনিয়া ও তার মোহ মুক্ত করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছু থেকে বিমুখ হওয়া।
বিজ্ঞাপন
ইমাম গাজালি (রহ.) রোজার তিন শ্রেণি উল্লেখ করে বলেন, প্রথম প্রকারের রোজা কোনো মুমিনের প্রত্যাশা হতে পারে না। আর তৃতীয় শ্রেণির রোজা দীর্ঘ সাধনার ব্যাপার। মুমিনের প্রথম টার্গেট হওয়া উচিত দ্বিতীয় শ্রেণির রোজা। অতঃপর তিনি আল্লাহভীরু ও পুণ্যবান ব্যক্তিদের রোজা তথা দ্বিতীয় শ্রেণি রোজার ছয়টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো—
১) দৃষ্টি অবনত রাখা
আল্লাহ যার প্রতি তাকাতে নিষেধ করেছেন এমন সব কিছু থেকে দৃষ্টি অবনত রাখা। এবং সেসব বিষয় থেকেও দৃষ্টিকে সংরক্ষণ করা, যা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দৃষ্টি শয়তানের বিষাক্ত তীর। যে আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টি সংরক্ষণ করবে, সে ঈমান ও তার মিষ্টতা লাভ করবে।’ (মুসনাদে হাকিম)
২) জিহ্বা সংযত করা
মিথ্যা, পরনিন্দা, অপবাদ, অশ্লীলতা, গালি ও অনর্থক কথা থেকে নিজের জবান সংরক্ষণ করা। মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ‘দুটি স্বভাব রোজার মাহাত্ম্য নষ্ট করে দেয়। মিথ্যা ও পরনিন্দা।’ (সিয়ারু আলামুন-নুবালা)
৩) কান সংরক্ষণ করা
আল্লাহর অপছন্দনীয় সব বিষয় থেকে নিজের কান সংরক্ষণ করা। গান-বাদ্য, মিথ্যা-পরনিন্দা, অর্থহীন গালগল্প থেকে বেঁচে থাকা। আল্লাহ তাআলা মিথ্যা শ্রবণকারীর নিন্দা করে বলেছেন, ‘তারা মিথ্যা শ্রবণকারী ও অবৈধ সম্পদ ভক্ষণকারী।’ (সুরা মায়িদা: ৪৬)
৪) অন্য অঙ্গগুলোকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখা
হাত-পাসহ বাকি অঙ্গগুলোকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখা রোজাদারের জন্য আবশ্যক। যেমন, অন্যায়ভাবে কাউকে আঘাত করা যাবে না, অন্যায় কাজে যাওয়া যাবে না এবং হারাম খাবার খাওয়া যাবে না। পাপ পরিহার না করলে রোজার কল্যাণ লাভ করা যায় না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘কিছু রোজাদার এমন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া তাদের আর কোনো প্রাপ্তি থাকে না।’ (মুসনাদে আহমদ)
৫) ইফতার ও সেহেরিতে কম খাওয়া
রোজাদার ব্যক্তি ইফতার ও সেহরিতে কম খাবে। কেননা রাসুলুল্লাহ (স.) কম খেতে উৎসাহিত করেছেন। রোজাদার ব্যক্তি যথাসম্ভব দিনের বেলা কম ঘুমাবে। এতে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও দুর্বলতা বেশি অনুভূত হয়। প্রতি রাতে সামান্য পরিমাণ হলেও তাহাজ্জুদ আদায় করবে, যেন তার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
৬) আশা ও ভয় নিয়ে ইফতার করা
ইফতারের সময় বান্দা রোজা কবুল হওয়ার এবং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় নিয়ে ইফতার করবে। কেননা আল্লাহ তাআলা রমজানে বান্দার প্রতি অনুগ্রহশীল হওয়ার ঘোষণা যেমন দিয়েছেন, ঠিক তেমনি পাপ মার্জনা করাতে না পারলে শাস্তিরও ঘোষণা দিয়েছেন। কেননা ঈমান আশা ও ভয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানের নাম।
ছয়টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার পর ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, এই ছয়টি হলো সেই আমানত, যা রক্ষা করতে হাদিসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই রোজা আমানত। তোমরা তোমাদের আমানত রক্ষা করো।’(বিস্তারিত দেখুন: ইহয়াউ উলুমিদ্দিন: ১/৪৫৪-৪৫৯)
মনে রাখতে হবে, যে বান্দা নিজেকে গুনাহ থেকে হেফাজত করার ব্যাপারে সচেষ্ট, আল্লাহ তার জন্য মেহেরবান। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তোমাদের যা নিষেধ করা হয়েছে, তার মধ্যে যা গুরুতর তা থেকে বিরত থাকলে তোমাদের লঘুতর পাপগুলো ক্ষমা করে দেব। এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব।' (সূরা নিসা: ৩১)
অতএব, আমরা যদি কেবল আল্লাহকে খুশি করার জন্য রোজা পালন করতে পারি এবং নিজের হাত, পা, জিহ্বা, লজ্জাস্থানসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোতে গুনাহ থেকে বিরত রাখতে পারি, সেইসঙ্গে ভয় ও আশা নিয়ে ইবাদত-বন্দেগীসহ পরিপূর্ণ সংযম অবলম্বন করতে পারি, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি মিলবে এবং তাঁর কুদরতি হাতে প্রতিদান লাভ করতে পারব ইনশাআল্লাহ। কারণ তিনিই বলেছেন, রোজা আমারই জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেব।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে যেভাবে রোজা রাখলে তিনি সন্তুষ্ট হবেন, সেভাবে রোজা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।