মুসলমানদের জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ফরজ। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, ইশারায়—যে অবস্থায় সম্ভব নামাজ ছাড়া যাবে না। একজন মুমিন ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে, দেশে-বিদেশে, সাগরে-মহাকাশে যেখানেই অবস্থান করে, তাকে নামাজ পড়তেই হবে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘...নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় করা মুমিনদের জন্য অবশ্যকর্তব্য।’ (সুরা নিসা: ১০৩)
প্রশ্ন হলো— নবীজির একটি প্রসিদ্ধ হাদিস ‘আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবে নামাজ পড়ো’ এখানে কি নারী-পুরুষ সবাই উদ্দেশ্য? অর্থাৎ নবীজি কি এই হাদিসের মাধ্যমে নারী-পুরুষের নামাজের নিয়ম একই বলেছেন? এর উত্তর জানতে হলে আগে মূল হাদিসটি দেখতে হবে এবং কোন প্রসঙ্গে কাকে নবীজি নির্দেশটি দিয়েছিলেন সেটি জানতে হবে। সেইসঙ্গে হাদিসের ব্যাখ্যা জেনে নিতে হবে। এখানে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বিজ্ঞাপন
মূল হাদিসটি হলো— عَنْ أَبِي سُلَيْمَانَ مَالِكِ بْنِ الحُوَيْرِثِ، قَالَ: أَتَيْنَا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَنَحْنُ شَبَبَةٌ مُتَقَارِبُونَ، فَأَقَمْنَا عِنْدَهُ عِشْرِينَ لَيْلَةً، فَظَنَّ أَنَّا اشْتَقْنَا أَهْلَنَا، وَسَأَلَنَا عَمَّنْ تَرَكْنَا فِي أَهْلِنَا، فَأَخْبَرْنَاهُ، وَكَانَ رَفِيقًا رَحِيمًا، فَقَالَ: «ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ، فَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ، وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي، وَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلاَةُ، فَلْيُؤَذِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ، ثُمَّ لِيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ
আবূ সুলাইমান মালিক ইবনু হুওয়ায়রিস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন নবী (স.)-এর নিকটে আসলাম। তখন আমরা ছিলাম প্রায় সমবয়সী যুবক। বিশ দিন তাঁর কাছে আমরা থাকলাম। তিনি বুঝতে পারলেন, আমরা আমাদের পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছি। যাদের আমরা বাড়িতে রেখে এসেছি তাদের ব্যাপারে তিনি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তা তাঁকে জানালাম। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয় ও দয়ার্দ্র। তাই তিনি বললেন- তোমরা তোমাদের পরিজনের নিকট ফিরে যাও। তাদের (কোরআন) শিক্ষা দাও, সৎ কাজের আদেশ কর এবং যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ ঠিক তেমনভাবে সালাত আদায় কর। সালাতের ওয়াক্ত হলে তোমাদের একজন আজান দেবে এবং যে তোমাদের মধ্যে বড় সে ইমামাত করবে।’ (বুখারি: ৬০০৮)
এই হাদিসে দেখা যাচ্ছে, নবীজির কাছে কতিপয় যুবক সাহাবি এসেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ নারী ছিলেন না। তাঁদেরকে তাদের এলাকায় গিয়ে কোরআন শিক্ষা ও সৎ কাজের আদেশের নির্দেশনা দিলেন। এরপর বললেন, আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবে তোমরা নামাজ পড়বে এবং তোমাদের একজন আজান দেবে, একজন ইমাম হবে।
হাদিসের কোথাও নারী পুরুষের নামাজের পদ্ধতি একই কথাটি নেই। মূলত পুরুষদের উদ্দেশ্যেই নবীজি কথাগুলো বলেছেন। তাছাড়া একই হাদিসেই তোমাদের মাঝে একজন আজান দেবে, আর তোমাদের মাঝে যে বড় সে ইমাম হবে—এই কথাগুলোও পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। কারণ নারীদের জন্য আজান দেওয়া ও ইমাম হওয়া ইসলামে নিষেধ।
বিজ্ঞাপন
তাই হাদিসটির মাধ্যমে নারী-পুরুষের নামাজের পদ্ধতি একইরকম কেয়াসটি ভুল। বরং নামাজের পদ্ধতি নারী-পুরুষের জন্য আলাদা। এটি প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে চলমান পার্থক্য। এই বিষয়ে চার মাজহাবের ইমামগণ একমত। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িনদের ফতোয়াও একই। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারাই এটি প্রমাণিত।
তাবেয়ি ইয়াজিদ বিন আবি হাবিব (রহ) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (স.) দুই মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদেরকে (সংশোধনের উদ্দেশ্য) বললেন-‘যখন সেজদা করবে তখন শরীর জমিনের সাথে মিলিয়ে দিবে। কেননা মহিলারা এক্ষেত্রে পুরুষদের মতো নয়। (বায়হাকি: ৩০১৬, কিতাবুল মারাসিল লি ইমাম আবু দাউদ: ৫৫, হাদিস নং: ৮০)
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আলেম নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আওনুল বারি’ (১/৫২০) তে লিখেছেন-‘উল্লেখিত হাদিসটি সকল ইমামদের উসুল অনুযায়ী দলিল হিসেবে পেশ করায় যোগ্য। মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আমির ইয়ামানি “সুবুলুস সালাম” শরহু বুলুগিল মারাম” গ্রন্থে (১/৩৫১-৩৫২) এই হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে পুরুষ ও মহিলার সেজদার পার্থক্য করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুল (স.) ইরশাদ করেছন-‘মহিলা যখন নামাজের মধ্যে বসবে তখন যেন (ডান) উরু অপর উরুর উপর রাখে। আর যখন সেজদা করবে তখন যেন পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখে। যা তার সতরের জন্য অধিক উপযোগী। আল্লাহ তাআলা তাকে দেখে বলেন- ওহে আমার ফেরেস্তারা! তোমরা সাক্ষী থাক। আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। (সুনানে বায়হাকি: ২/২২৩, হাদিস নং: ৩৩২৪, হাদিসটি হাসান)
ওয়াইল বিন হুজর (রা.) বলেন, আমি নবীজি (স.)-এর দরবারে হাজির হলাম। তখন তিনি আমাকে (অনেক কথার সাথে একথাও) বলেছিলেন যে, হে ওয়াইল বিন হুজর! যখন তুমি নামাজ শুরু করবে তখন কান বরাবর হাত উঠাবে। আর মহিলা হাত উঠাবে বুক বরাবর। (আল মুজামুল কাবির: ২৮, হাদিসের মান- হাসান)
ইবরাহিম নাখয়ি (রহ) বলেন, মহিলা যখন সেজদা করবে তখন যেন সে উভয় উরু মিলিয়ে রাখে এবং পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখে। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ১/৩০২, হাদিস নং: ২৭৯৫)
ইবরাহিম নাখয়ি (রহ) আরও বলেন, ‘মহিলাদের আদেশ করা হত তারা যেন সেজদা অবস্থায় হাত ও পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখে। পুরুষের মত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফাঁকা না রাখে। যাতে কোমড় উঁচু হয়ে না থাকে। (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ৩/১৩৭, হাদিস নং: ৫০৭১)
হজরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘মহিলা যখন সেজদা করে তখন সে যেন খুব জড়সড় হয়ে সেজদা করে এবং উভয় উরু পেটের সাথে মিলিয়ে রাখে।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ৩/১৩৮, হাদিস: ৫০৭২, মুসান্নাফে ইবনে শাইবা: ২/৩০৮, হাদিস: ২৭৯৩, সুনানে কুবরা বায়হাকি: ২/২২২)
ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো- মহিলারা কিভাবে নামাজ আদায় করবে? তিনি বললেন, ‘খুব জড়সড় হয়ে অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে নামাজ আদায় করবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১/৩০২, হাদিস: ২৭৯৪)
বিশিষ্ট তাবেয়ি আতা বিন আবি রাবাহকে জিজ্ঞেস করা হলো- ‘নামাজে মহিলা কতটুকু হাত উঠাবে?’ তিনি বললেন-‘বুক বরাবর’। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১/২৭০, হাদিস: ২৪৮৬)
হানাফি মাজহাবে নারীদের নামাজে বসার পছন্দনীয় পদ্ধতি হলো—উভয় পা এক পাশে মিলিয়ে রাখবে, পুরুষের মতো এক পা দাঁড় করিয়ে রাখবে না। (কিতাবুল আসার: ১/৬০৯, আরো দ্রষ্টব্য- হেদায়া: ১/১০০-১১০-১১১- ফতোয়ায়ে শামি: ১/৫০৪- ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/৭৩)
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, আল্লাহ পাক নারীদেরকে পুরোপুরি পর্দায় থাকার শিক্ষা দিয়েছেন এবং রাসুল (স.)-ও অনুরূপ শিক্ষা দিয়েছেন। তাই আমার নিকট পছন্দনীয় হলো- সেজদা অবস্থায় নারীরা এক অঙ্গের সাথে অপর অঙ্গকে মিলিয়ে রাখবে, পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে এবং সেজদা এমনভাবে করবে যাতে সতরের অধিক হেফাজত হয়। (যাখিরা, ইমাম কারাফি: ২/১৯৩)
তাকবিরে নারীদের হাত ওঠানো সম্পর্কে ইমাম আহমদ (রহ) বলেন, হাত তুলনামূলক কম ওঠাবে। (আল মুগনি: ২/১৩৯)
হাদিস, আসারে সাহাবা, আসারে তাবেয়িন ও ইমামদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট হলো যে, পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতির অভিন্ন নয় বরং ভিন্ন।
ইসলামে নারীর ইবাদত কিছুটা আলাদা হওয়ার কারণ হলো-তাদের শারীরিক গঠন, সক্ষমতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় পুরুষ থেকে ভিন্ন। যেমন—ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য মাথা ঢাকা নিষেধ। কিন্তু মহিলাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় মাথা ঢেকে রাখা ফরজ। ইহরাম খোলার সময় পুরুষ মাথা মুণ্ডায়; কিন্তু মহিলাদের মাথা মুণ্ডানো নিষেধ। পুরুষের ওপর জুমা পড়া ফরজ, নারীদের ওপর নয়। ইমাম ও খতিব শুধু পুরুষই হতে পারে, কোনো নারী হতে পারে না। আজান শুধু পুরুষই দিবে, কোনো নারীকে মুয়াজ্জিন বানানো জায়েজ নেই। পুরুষের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। আর পরপুরুষের সামনে নারীদের প্রায় পুরো শারীরই ঢেকে রাখা ফরজ ইত্যাদি। ঠিক তেমনিভাবে নামাজের নিয়মের ক্ষেত্রেও ইসলামি শরিয়ত নারী-পুরুষের মধ্যে বেশ কিছু বিধানগত ভিন্নতা দিয়েছে। যেমন তাকবিরে তাহরিমার জন্য হাত উঠানো, হাত বাঁধা, রুকু, সেজদা, প্রথম ও শেষ বৈঠক ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে পুরুষের সঙ্গে নারীর পার্থক্য রয়েছে। নারী পুরুষের নামাজের নিয়ম
মূলত সতরের পরিমাণ যেহেতু নারীদের বেশি তাই যেভাবে নামাজ পড়লে তাদের নিরাপত্তা বেশি রক্ষা হয় সেদিকটি বিবেচনায় নিয়েছে শরিয়ত।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা পরিস্কার হয়ে গেল যে, নামাজ আদায় পদ্ধতিতে নারী ও পুরুষ ভেদে কিছুটা পার্থক্য আছে এবং তা বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত।
অতএব, নবীজির প্রসিদ্ধ হাদিস ‘তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবেই নামাজ পড়’ দ্বারা পুরুষ সাহাবিরাই উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহিহ বুঝ দান করুন। ভুল কেয়াস করা থেকে সাবধান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন। সাল্লু কামা রাআইতুমুনি ওসাল্লি, আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবে নামাজ পড়

