বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

খুতবার সময় কোন পরিস্থিতিতে কথা বলা জায়েজ

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল ২০২২, ১২:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

খুতবার সময় কোন পরিস্থিতিতে কথা বলা জায়েজ

জুমার নামাজে নীরবতা পালন করে ইমামের খুতবা শোনা ওয়াজিব। অর্থাৎ খুতবা চলাকালে কারও সঙ্গে কথা বলা নাজায়েজ। এমনকি ‘জুমার দিন ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় আপনি যদি পাশের কাউকে বলেন- চুপ থাকুন; তাহলে আপনি জুমার সওয়াব নষ্ট করে দিলেন।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯২; সহিহ মুসলিম: ৮৫১)

সাধারণত মসজিদে যেসব বিষয়ে কথা বলা নাজায়েজ নয়, খুতবার সময় তাও নিষেধ। হাদিস থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাক। আবুদ দারদা (রা.) বলেন, নবী (স.) মিম্বরে বসে মানুষের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি একটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন। আমার পাশে ছিল উবাই ইবনে কাব। আমি তাঁকে বললাম: উবাই; এ আয়াতটি কখন নাজিল হয়েছে? তিনি কোনো সাড়া দিলেন না। আমি এরপরেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। তারপরেও তিনি কোনো সাড়া দিলেন না। এক পর্যায়ে রাসুল (স.) যখন মিম্বর থেকে নামলেন তখন উবাই আমাকে বললেন: তুমি যে অনর্থক কথা বলেছ, সেটা ছাড়া তুমি জুমার কোনো সওয়াব পাবে না। অতঃপর রাসুল (স.) যখন নামাজ শেষ করলেন, তখন আমি তার কাছে এসে বিষয়টি জানালাম। তখন তিনি বললেন, উবাই ঠিক বলেছে। যখন ইমাম কথা বলা শুরু করে, তখন ইমাম কথা শেষ করা পর্যন্ত চুপ থাকবে”। (মুসনাদে আহমদ: ২০৭৮০; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১১১১; তামামুল মিল্লাহ: ৩৩৮)


বিজ্ঞাপন


এ হাদিসটি প্রমাণ করে যে, জুমার দিন ইমামের খুতবাকালে নীরবতা পালন করা ওয়াজিব এবং কথা বলা হারাম। ইবনে আবদুল বার বলেন, ফিকাহবিদদের মাঝে এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই যে, যে ব্যক্তির কানে খুতবার শব্দ পৌঁছে, তার উপর চুপ থাকা ওয়াজিব। (আল-ইসতিজকার: ৫/৪৩)

শাইখ আলবানি বলেন, কাউকে এ কথা বলা যে, ‘চুপ থাকুন’ আভিধানিক অর্থে অনর্থক কথা নয়। কারণ, এটি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। তা সত্ত্বেও নবী (স.) এটিকে অনর্থক কথা ও নাজায়েজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। খুতবাকালে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথা ‘খুতবা শোনার জন্য নীরবতা পালনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তিনি এটাকে অনর্থক কথা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং যেসব কাজ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের সমপর্যায়ভুক্ত সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। আর যদি সমপর্যায়ভুক্ত না হয়ে নিম্নপর্যায়ের হয় তাহলে নিঃসন্দেহে সেটি শরিয়তের দৃষ্টিতে অনর্থক ও নিষিদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। (আল-আজউয়িবা আন-নাফিআ, পৃষ্ঠা-৪৫)

এমনকি জুমার খুতবা চলাকালে সালাম দেওয়াও হারাম। অতএব, ইমামের খুতবা চলাকালে যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করল তার জন্য সালাম দেয়া জায়েজ নয় এবং অন্যদের সে সালামের উত্তর দেয়াও জায়েজ নয়। (বিন উসাইমিনের ফতোয়াসমগ্র: ১৬/১০০)

তবে, প্রয়োজনবশত কিংবা কল্যাণার্থে ইমামের সঙ্গে কথা এবং মুক্তাদিদের সঙ্গে ইমামের কথা বলা জায়েজ আছে। এর দলিল হচ্ছে—


বিজ্ঞাপন


আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.)-এর সময়ে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। সে সময় একদিন নবী (স.) জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন, সে মুহূর্তে একজন বেদুইন দাঁড়িয়ে বলল: হে আল্লাহর রাসুল! সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পরিবার-পরিজন ক্ষুধায় কাতর। আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তখন তিনি দুই হাত তুললেন...। তাঁর দোয়ার ফলে সেদিন বৃষ্টি নামল, এরপরের দিনও বৃষ্টি হলো, এরপরের দিন, এরপরের দিনও বৃষ্টি হল, পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকল। সেই জুমাতে একই বেদুইন অথবা অন্য একজন দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! ঘরবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে। সম্পদ ডুবে যাচ্ছে। আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তখন তিনি দুই হাত তুললেন...।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯১; সহিহ মুসলিম: ৮৯৭)

জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারিম (স.) জুমার দিন খুতবাদানকালে এক ব্যক্তি (নামাজে) এলো। তখন নবী (স.) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে অমুক! তুমি কি নামাজ পড়েছ? সে বলল, না। তিনি বললেন, দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নাও। (সহিহ বুখারি: ৮৮৮; সহিহ মুসলিম: ৮৭৫)

তবে যারা উল্লেখিত হাদিসগুলো দিয়ে মুসল্লিদের নীরবতা পালন করা ওয়াজিব নয় বলে দলিল দেন, তাদের অভিমত সঠিক নয়। এ প্রসঙ্গে ইবনে কুদামা বলেন, তারা যে হাদিসগুলো দিয়ে দলিল দেন, সে হাদিসগুলো কোনোটি ঈমামের সঙ্গে কথা বলার সাথে খাস; আর কোনোটি মুসল্লির সঙ্গে ঈমামের কথা বলার সাথে খাস। এতে করে খুতবা শোনায় ব্যাঘাত ঘটে না। একারণে নবী (স.) জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি নামাজ পড়েছ? সে ব্যক্তি নবী (স.)-এর প্রশ্নের জবাব দেন। অনুরূপভাবে উসমান (রা.) খুতবা প্রদানকালে উমর (রা.) তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি প্রশ্নের জবাব দেন। তাই এ ধরণের হাদিসগুলোকে এ অর্থে গ্রহণ করা অনিবার্য; যাতে করে সবগুলো হাদিসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা যায়। অন্য কোনো অবস্থাকে এর উপর কেয়াস করা সহিহ হবে না। কারণ খুতবা প্রদানকালে তো ইমামের অন্য কোনো কথা বলার সুযোগ নেই; যেমনটি মোক্তাদিদের সুযোগ আছে। (আল-মুগনি: ২/৮৫)

শাইখ উসাইমিন তার রচিত ‘আল-শারহুল মুমতি’ (৫/১৪০) গ্রন্থে বলেন, কোনো কল্যাণের স্বার্থ ছাড়া ঈমামেরও কথা বলা নাজায়েজ। কথা বললে সেটা নামাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কল্যাণের স্বার্থে কিংবা যে বিষয়ে তখন কথা বলাটা ভালো এমন কিছু হতে হবে। কোনো কল্যাণের বিষয় না হলে ইমামের কথা বলা নাজায়েজ।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে জুমার আদব রক্ষা ও এদিনের সহিহ সুন্নাহগুলো যথাযথ পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর