শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ঢাকা

১২ জুন থেকে ফ্রান্সে আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়

ফ্রান্স থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম 
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

F
ফ্রান্স। ফাইল ছবি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন মাইগ্রেশন ও অ্যাসাইলাম প্যাক্ট বৃহস্পতিবার (১১ জুন) থেকে ফ্রান্সে কার্যকর হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আলোচনা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এবং ইউরোপে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন সংকটের প্রেক্ষাপটে গৃহীত এই প্যাক্টকে ইউরোপীয় অভিবাসন নীতির সবচেয়ে বড় সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি নিশ্চিত করা এবং অনিয়মিত অভিবাসন কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 


বিজ্ঞাপন


তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, নতুন বিধান আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার সংকুচিত করতে পারে এবং সীমান্তে আটকে রাখার প্রবণতা বাড়াতে পারে।

ফ্রান্সভিত্তিক ইউরোপে অভিবাসীদের বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ইনফো-মাইগ্রেন্টস সূত্র থেকে জানা গেছে, নতুন প্যাক্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে সীমান্তে আশ্রয় আবেদন গ্রহণের ক্ষেত্রে। এখন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিঃসীমান্তে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করে আশ্রয় আবেদনকারী প্রত্যেককে বাধ্যতামূলকভাবে একটি ‘ফিল্টারিং’ বা প্রাথমিক যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। 

ফ্রান্সে এই ব্যবস্থা মূলত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরগুলোতে চালু হবে। বৃহত্তর প্যারিস অঞ্চলের রোয়াসি শার্ল দ্য গল, অর্লি এবং বুভে বিমানবন্দরকে এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ফিল্টারিং প্রক্রিয়ার সময় একজন আবেদনকারীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে বলে গণ্য করা হবে না। তাকে সীমান্তসংলগ্ন নির্ধারিত এলাকা বা ট্রানজিট জোনে অবস্থান করতে হবে। সর্বোচ্চ সাত দিনের এই পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর পরিচয়, নাগরিকত্ব, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করবে। 


বিজ্ঞাপন


ফরাসি কর্তৃপক্ষের মতে, এর মাধ্যমে দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব হবে কোন আবেদন সাধারণ আশ্রয় প্রক্রিয়ায় যাবে এবং কোনটি সীমান্ত পর্যায়েই নিষ্পত্তি করা হবে।

যাচাই শেষে একজন আবেদনকারীকে দুই ধরনের প্রক্রিয়ার একটিতে পাঠানো হতে পারে। যদি তার আবেদন সাধারণ আশ্রয় পদ্ধতির আওতায় বিবেচিত হয়, তাহলে তিনি ফ্রান্সে প্রবেশের অনুমতি পাবেন এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আশ্রয় আবেদন করবেন। 

কিন্তু যদি কর্তৃপক্ষ মনে করে যে, আবেদনটি সীমান্ত পর্যায়েই মূল্যায়ন করা উচিত, তাহলে তাকে ‘সীমান্ত আশ্রয় প্রক্রিয়া’র আওতায় রাখা হবে। সে ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ একটি বিশেষ কেন্দ্রে অবস্থান করতে হবে এবং এই সময়ের মধ্যেই তার আবেদন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ফরাসি আশ্রয় সংস্থা অফপ্রা জানিয়েছে, আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকার শুধু সরাসরি নয়, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমেও নেওয়া হবে। বিশেষ করে রোয়াসি বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি ডিজিটাল সাক্ষাৎকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে থাকা আবেদনকারীদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা যায়।

নতুন বিধান অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন অনুমোদনের হার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০ শতাংশ বা তার কম, তারা সীমান্ত আশ্রয় প্রক্রিয়ার আওতায় পড়তে পারেন। একইভাবে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত ব্যক্তি অথবা যারা কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন বলে সন্দেহ করা হয়, তাদের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি প্রযোজ্য হতে পারে। 

তবে ১২ সপ্তাহের মধ্যে কোনো আবেদন নিষ্পত্তি না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাধারণ আশ্রয় প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর করতে হবে এবং ফ্রান্সে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে।

নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু সীমান্তে ধরা পড়া ব্যক্তিদের জন্য নয়। ফ্রান্সের অভ্যন্তরে অনিয়মিত অবস্থায় শনাক্ত হওয়া কিছু অভিবাসীকেও একই ধরনের ফিল্টারিং প্রক্রিয়ার আওতায় আনা যেতে পারে। ফলে প্রশাসনের হাতে আশ্রয় আবেদনকারীদের শনাক্ত ও বাছাইয়ের একটি নতুন ব্যবস্থা যুক্ত হলো।

আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে কী হবে?

এ বিষয়েও বড় পরিবর্তন এসেছে। সীমান্ত আশ্রয় প্রক্রিয়ার আওতায় থাকা কোনো ব্যক্তির আবেদন বাতিল হলে, তাকে ফ্রান্স ত্যাগ করতে হবে। যেহেতু তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি, তাই তাকে প্রশাসনিক আটককেন্দ্রে পাঠানোর পরিবর্তে সীমান্তসংলগ্ন অপেক্ষা এলাকায় রাখা হবে। এই পর্যায়কে ‘সীমান্ত প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া’ বলা হচ্ছে এবং এটি সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

F
ফ্রান্সের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরো নুনেজ

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন ব্যবস্থায় আপিল বিচার শেষ হওয়ার আগেই বহিষ্কার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ফরাসি জাতীয় আশ্রয় আদালতে আপিল করলে সাধারণত বহিষ্কার কার্যক্রম স্থগিত থাকে। কিন্তু নতুন নিয়মে সেই সুরক্ষা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রত্যাখ্যাত আবেদনকারীদের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ডাবলিন প্রবিধানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নীতিমালার আওতায় কোনো আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন পরীক্ষা করার দায়িত্ব সাধারণত প্রথম নিবন্ধনকারী দেশের ওপর বর্তায়। নতুন নিয়মে সেই দায়বদ্ধতার সময়সীমা ১২ মাস থেকে বাড়িয়ে ২০ মাস করা হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে নতুন করে আবেদন করার সুযোগ আরও সীমিত হবে। পাশাপাশি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক সমন্বয়ও সহজ হবে। কারণ আগের মতো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানোর পরিবর্তে এখন কেবল নোটিফিকেশন দিলেই সংশ্লিষ্ট দেশকে আবেদনকারীকে পুনরায় গ্রহণ করতে হবে।

অন্যদিকে ইতালি, গ্রিস এবং স্পেনের মতো সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর চাপ কমাতে ‘সংহতি ব্যবস্থা’ চালু করা হয়েছে। ফ্রান্স জানিয়েছে, এই ব্যবস্থার আওতায় কয়েক হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে তাদের প্রথম নিবন্ধনকারী দেশে ফেরত পাঠানো হবে না। এর মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

নতুন প্যাক্টের আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে ইউরোড্যাক ডেটাবেজে। এতদিন ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সি আশ্রয়প্রার্থীদের আঙুলের ছাপ সংরক্ষণ করা হতো। এখন থেকে এই ব্যবস্থার পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। আঙুলের ছাপের পাশাপাশি মুখের বায়োমেট্রিক তথ্যও সংরক্ষণ করা হবে। 

ছয় বছর বয়সি শিশুদেরও এই ডেটাবেজের আওতায় আনা হয়েছে। শুধু আশ্রয়প্রার্থী নয়, অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করা ব্যক্তিরাও এই তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হবেন, তারা আশ্রয় আবেদন করুক বা না-করুক।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শিশুদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংরক্ষণ ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তবে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একাধিক দেশে একাধিক পরিচয়ে আবেদন ঠেকানোর জন্য এই ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আশ্রয়প্রার্থীদের গ্রহণসংক্রান্ত নিয়মে তুলনামূলক কম পরিবর্তন এসেছে। ফ্রান্সে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা এবং আশ্রয়প্রার্থীদের ভাতা আগে থেকেই চালু রয়েছে। আশ্রয় আবেদন নিবন্ধনের ছয় মাস পর শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগও বহাল থাকবে। 

তবে ডাবলিন প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত ব্যক্তিরা আর আগের মতো সামাজিক সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানোর নোটিফিকেশন জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা এসব অধিকার হারাতে পারেন। অন্যদিকে পুনরায় আবেদনকারী এবং বিলম্বে আবেদনকারীদের জন্য সীমিত পরিসরে কিছু সামাজিক সুবিধা চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মাইগ্রেশন ও অ্যাসাইলাম প্যাক্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এর মাধ্যমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর হবে, আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে। 

তবে একই সঙ্গে আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং আইনি প্রতিকারের সুযোগ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। আগামী মাসগুলোতে এই নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই বৃহৎ সংস্কার কতটা সফল হয় এবং এর মানবিক মূল্য কতটা গ্রহণযোগ্য থাকে।

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর