রোববার, ২৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়াচ্ছে ফ্রান্স, দেশজুড়ে ক্ষোভ

প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়াচ্ছে ফ্রান্স, দেশজুড়ে ক্ষোভ
লিয়ন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস। ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দেশগুলো থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্স সরকার। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা ক্রোয়া, লে ত্যুদিয়ঁ, রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল ও ইনফো-মাইগ্রেন্টসের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি ডিক্রিতে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন নীতি কার্যকরের কথা জানানো হয়েছে। সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক শিক্ষাবাজারে ফ্রান্সকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা এবং মেধাবী বিদেশি শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


তবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলছে, নতুন এ নীতি বৈষম্যমূলক। এতে আর্থিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সংকুচিত হবে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইইউর বাইরের দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের লাইসেন্স বা ব্যাচেলর পর্যায়ে বছরে ২ হাজার ৮৯৫ ইউরো টিউশন ফি দিতে হবে। বর্তমানে এ ফি ১৭৮ ইউরো। মাস্টার্স পর্যায়ে টিউশন ফি ২৫৪ ইউরো থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩ হাজার ৯৪১ ইউরো।

ফরাসি উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত সরকারের উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সকে বেছে নিন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন। সরকারের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর আদলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায় ফ্রান্স। বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশি ফি নেওয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ফি কাঠামো প্রথম চালু হয় ২০১৯ সালে। তবে এত দিন অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বাড়তি ফি কার্যকর করেনি। বিভিন্ন ছাড় ও অব্যাহতির মাধ্যমে তারা আগের কম ফি বহাল রেখেছিল। ফলে বাস্তবে অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী স্বল্প খরচেই পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন।


বিজ্ঞাপন


এবার সরকার সেই সুযোগ সীমিত করার পথে হাঁটছে। প্রথম খসড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত ফি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে সরকার কিছুটা নমনীয় হয়। সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত ফি থেকে অব্যাহতি দিতে পারবে। ২০২৭ সালে এ হার কমে ২৫ শতাংশ হবে। আর ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তা নেমে আসবে ২০ শতাংশে।

সরকারের যুক্তি, বর্তমানে ফরাসি করদাতাদের অর্থে বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। নতুন নীতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নত হবে। একই সঙ্গে সরকার বলছে, এতে উচ্চ সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। এর বিনিময়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে ওয়ার্ক ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে অন্যায্য ও অসঙ্গতিপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এ নীতির ফলে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু শিক্ষার্থী ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষ করে ফরাসিভাষী আফ্রিকান দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শিক্ষক সংগঠন উনসা সুপ-রিসার্চের মহাসচিব আলি শেরিফ বলেন, ফ্রান্স সবসময় বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু এখন সেখানে সীমাবদ্ধতা ও কার্যত কোটা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

নতুন নীতির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। গত ১২ মে প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে প্রথম দফার বিক্ষোভ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার একদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার কথা বলছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ফি চাপিয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে।

বিভিন্ন শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনের জোট আগামী ২৬ মে আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তাদের দাবি, সরকারকে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় বাড়লেও উন্নয়নশীল দেশের বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য ফ্রান্সে পড়াশোনা কঠিন হয়ে উঠবে। ফলে দেশটির ঐতিহ্যগত উন্মুক্ত ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর