সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ফ্রান্সে মিউনিসিপ্যাল ভোট শুরু, আছেন বাংলাদেশি প্রার্থীরাও

মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে
প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

শেয়ার করুন:

ফ্রান্সে মিউনিসিপ্যাল ভোট শুরু, আছেন বাংলাদেশি প্রার্থীরাও

ফ্রান্সজুড়ে শুরু হয়েছে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন। দেশের বিভিন্ন শহর ও কমিউনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ। স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক জোট এবং স্বতন্ত্র তালিকার প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনেও ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ডজনের অধিক প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন, যা প্রবাসী কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফ্রান্সের প্রশাসনিক কাঠামোতে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন স্থানীয় গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সিটি কাউন্সিল সদস্যরা নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে তারাই নিজেদের মধ্য থেকে শহরের মেয়র নির্বাচন করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নগর উন্নয়ন, আবাসন, পরিবেশ, শিক্ষা, সামাজিক সেবা, স্থানীয় অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।


বিজ্ঞাপন


ফ্রান্সের মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন সাধারণত দুই ধাপে বা দুই “ট্যুরে” অনুষ্ঠিত হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়।

প্রথম ট্যুর: প্রথম ধাপে ভোটাররা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা নাগরিক তালিকার প্রার্থীদের মধ্যে ভোট দেন। কোনো তালিকা যদি মোট বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি পায়, তাহলে সেই তালিকা সরাসরি বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দ্বিতীয় ধাপের ভোটের প্রয়োজন হয় না।

তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো তালিকা সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। তখন নির্বাচন গড়ায় দ্বিতীয় ধাপে।

দ্বিতীয় ট্যুর: প্রথম ট্যুরে কোনো তালিকা ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট পাওয়া তালিকাগুলো দ্বিতীয় ট্যুরে অংশ নিতে পারে। অনেক সময় বিভিন্ন তালিকা একে অপরের সঙ্গে সমঝোতা বা জোট গঠন করে নতুন তালিকা তৈরি করে দ্বিতীয় ধাপে অংশ নেয়।


বিজ্ঞাপন


দ্বিতীয় ট্যুরে যে তালিকা সর্বাধিক ভোট পায় তারা সিটি কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। এরপর নির্বাচিত কাউন্সিল সদস্যরা তাদের মধ্য থেকে শহরের মেয়র নির্বাচন করেন।

এবারের নির্বাচনে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কয়েকজন প্রার্থী স্থানীয় রাজনৈতিক তালিকায় অংশ নিচ্ছেন। কেউ মূলধারার রাজনৈতিক দলের হয়ে, আবার কেউ নাগরিক জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

কাউন্সিলর প্রার্থী চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান শরীফ আল মোমিনের মতে, এটি শুধু রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নয়; বরং ফরাসি সমাজে বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন। গত দুই দশকে ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি এখন অনেকেই স্থানীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন।

ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের আগমন মূলত গত শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে রাজধানী অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি কমিউনিটির বসবাস বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে নতুন প্রজন্ম ফরাসি নাগরিকত্ব লাভ করে এবং শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হতে শুরু করে।

গত কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিছু তরুণ প্রার্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তাদের অনেকেই সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।

কমিউনিটি নেতা বাংলাদেশী নাগরিক পরিষদের সভাপতি আবুল খায়ের লস্করের মতে, নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি তরুণরা এখন ফরাসি সমাজের মূলধারায় যুক্ত হচ্ছে। তারা শিক্ষা, নাগরিক অধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নে আরও সক্রিয়। ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ আগামী দিনে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

 বাংলাদেশি কমিউনিটির জনপ্রিয় সংগঠন ফোরাম ফর দি ডেমোক্রেসি এন্ড হিউম্যান রাইটস চেয়ারম্যান ও মানবাধিকার সংগঠক মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্ম এখানে বড় হয়েছে। তারা ফরাসি সমাজের অংশ। তাই শহরের উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যার সমাধানে তাদের অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রান্সে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সংগঠন ফ্রান্স বাংলাদেশ জার্নালিস্টস এসোসিয়েশন এফবিজেএ এর মুখপাত্র ও ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর এর সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ মনে করেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হলে অভিবাসী কমিউনিটির বিভিন্ন সমস্যা—যেমন আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সংহতির বিষয়গুলো স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের স্থানীয় রাজনীতিতে অভিবাসী পটভূমির নাগরিকদের অংশগ্রহণ দেশটির বহুসাংস্কৃতিক গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের অংশগ্রহণও সেই ধারার একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ক.ম/ 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর