ফ্রান্সে ২০২৬ সালের পৌর বা মিউনিসিপাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সেখানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিছু প্রার্থী সক্রিয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই নির্বাচন দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে নজরে এসেছে বাংলাদেশি কমিউনিটি যেখানে তাদের অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয় এই নির্বাচনে বাংলাদেশীদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করছে যে ফ্রান্সে বাংলাদেশিরা শুধু প্রবাসী নয়; তারা মূলধারার রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এই নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশেী কমিউনিটির মধ্যে এক ধরনের আনন্দ উদ্দীপনা বিরাজ করছে।
বিজ্ঞাপন
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, স্থানীয় কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলে শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমিউনিটির বাস্তব সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, ফ্রান্সে কাউন্সিলর পদে সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নেই, যেমনটি অনেক দেশে দেখা যায়। এখানে ভোটাররা আলাদাভাবে প্রতিটি কাউন্সিলর প্রার্থীর জন্য ভোট দেন না।
পৌরসভা নির্বাচনের সময় নাগরিকরা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা বা প্যানেলের পক্ষে ভোট দেন, যা সাধারণত মেয়র প্রার্থীর নেতৃত্বে গঠিত হয়। এই তালিকায় মেয়র প্রার্থীসহ একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী অন্তর্ভুক্ত থাকেন।
প্রতিটি তালিকা যে পরিমাণ ভোট পায়, তার ভিত্তিতে অনুপাতিকভাবে পৌর পরিষদের আসন বণ্টন করা হয়। ফলে তালিকায় যে প্রার্থীরা নির্দিষ্ট ক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকেন, তারা সেই ক্রম এবং তালিকার প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, ফ্রান্সে কাউন্সিলররা সরাসরি ব্যক্তিগত ভোটে নয়, বরং তালিকার প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন।
বিজ্ঞাপন
পরবর্তীতে গঠিত পৌর পরিষদের সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকেই একজনকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেন।
ফ্রান্সের আসন্ন ২০২৬ সালের পৌর নির্বাচনে বিভিন্ন শহরে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
রাব্বানী খান
বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ ও সফল ব্যবসায়ী রাব্বানী খান প্যারিসের শহরতলি এস্তা পৌরসভা থেকে পুনরায় কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক হিসেবে তাঁর প্যানেল থেকে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন ফরাসি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তিনি কমিউনিটিতে সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। আসন্ন নির্বাচনেও তিনি বর্তমান মেয়র আজেদিন তাইবির প্যানেল থেকে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সরুফ সোদিওল
২০২০ সালের মিউনিসিপাল নির্বাচনে সেইন্ট-ডেনিস এলাকা থেকে প্রথমবার অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন সরুফ সোদিওল। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের সক্রিয় উপস্থিতি জানান দেন।
এবারের মিউনিসিপাল নির্বাচনে তিনি বর্তমান মেয়র ম্যাতিউ হানোতিনের প্যানেলভুক্ত হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ফ্রান্সে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, যা প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি গর্বের বিষয়।
এনকে নয়ন
সমাজকর্মী ও রাজনীতিক এনকে নয়ন ইল-দ্য-ফ্রঁসের ভিন্যু-সুর-সেইন এলাকা থেকে লা ফ্রঁস আনসুমি সমর্থিত ‘ভিন্যু সলিদেয়ার এ পপুলেয়ার’ প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়েছেন। নিজ প্রতিষ্ঠিত ‘সাফ’ সংস্থার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিনামূল্যে বিভিন্ন কমিউনিটি সেবা প্রদান করে তিনি ইতোমধ্যেই স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন।
নয়ন জানান, তাঁর প্যানেলে তিনি ডেপুটি মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবেও রয়েছেন।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশিরা এখন শুধু প্রবাসী নয়; ফ্রান্সের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে সমাজ গঠনে অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত। স্থানীয় কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব থাকলে শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে কমিউনিটির বাস্তব সমস্যাগুলো সরাসরি তুলে ধরা সম্ভব হবে।”
আকাশ বড়ুয়া
পেশায় উদ্যোক্তা আকাশ বড়ুয়া ফ্রান্সের লা-কোরনুভ শহর থেকে স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত নাদিয়া ছাবুন প্যানেল থেকে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন।
তিনি বলেন, মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি রাজনীতিকরা ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারেন।
আব্দুস সামাদ
চাকরিজীবী আব্দুস সামাদ ইল-দ্য-ফ্রঁসের ভিন্যু-সুর-সেইন এলাকা থেকে লা ফ্রঁস আনসুমি সমর্থিত প্যানেল থেকে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন।
তিনি জানান, নির্বাচিত হলে কমিউনিটির কল্যাণ, ন্যায়বিচার এবং অংশীদারিত্বমূলক রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবেন।
নাসির উদ্দীন ভুঁইয়া
ব্যাংকার নাসির উদ্দীন ভুঁইয়া ফ্রান্সের লা-কোরনুভ এলাকায় মেয়র পদপ্রার্থী ওমারো দোকুরু প্যানেল থেকে কাউন্সিলর হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি মূলত অভিবাসী অধ্যুষিত এই এলাকার প্রতিনিধি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।
জুবাইদ আহমেদ
ফ্রান্স জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় জুবাইদ আহমেদ ইভরী-সুর-সেইন এলাকায় ফিলিপ বয়ুসু প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ফ্রন্ট পপুলেয়ার দলের প্যানেলভুক্ত হয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করছেন।
ফ্রান্সের মিউনিসিপাল নির্বাচন কাঠামোয় দেখা যায়, ২০২০ সালের ফ্রান্সের মিউনিসিপাল নির্বাচনে প্রায় ৩৫ হাজার কমিউনে নির্বাচন হয় এবং ৯০২,৪৬৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। চলতি বছরও ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে পৌর কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন। পরে নির্বাচিত কাউন্সিল সদস্যরাই নিজেদের মধ্য থেকে মেয়র নির্বাচন করবেন। অর্থাৎ, মেয়র সরাসরি জনগণের ভোটে নয়; বরং কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।
প্রথম দফায় কোনো তালিকা ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেলে তারা কাউন্সিলের অর্ধেক আসন বোনাস হিসেবে পায় এবং বাকি আসন আনুপাতিক হারে বণ্টন হয়। যদি প্রথম দফায় কেউ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তবে দ্বিতীয় দফা ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত তালিকা ‘মেজরিটি বোনাস’ লাভ করে।
ফ্রান্স প্রশাসনিকভাবে ১৮টি অঞ্চল (১৩টি মূল ভূখণ্ডে ও ৫টি বিদেশে), ১০১টি বিভাগ, ৩৩৩টি অ্যারোন্ডিসমেন্ট এবং প্রায় ৩৪,৮৭৫টি কমিউন নিয়ে গঠিত। রাজধানী প্যারিস অবস্থিত ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলেও একই নিয়মে মিউনিসিপাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা সারা দেশে একটি অভিন্ন ও সুসংগঠিত স্থানীয় শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
ফ্রান্সের মিউনিসিপাল নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের অংশগ্রহণকে স্থানীয় রাজনীতিতে বহু-সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এসব প্রার্থী কেবল নিজ কমিউনিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন; তারা বিভিন্ন কমিউনিটির ভোটারদের কাছেও সামাজিক নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছেন। স্থানীয় ইস্যুগুলো সামনে এনে তারা অংশগ্রহণমূলক ও সম্প্রদায়সচেতন রাজনীতির চর্চা করছেন, যা নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির বার্তা দিচ্ছে।
ক.ম/

