মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪, ঢাকা

এক কমিটিতেই ৭ বছর, ‘গ্রুপিং-কোন্দলে বিপর্যস্ত’ মহিলা দল

মো. ইলিয়াস
প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০২৩, ১০:০৭ এএম

শেয়ার করুন:

এক কমিটিতেই ৭ বছর, ‘গ্রুপিং-কোন্দলে বিপর্যস্ত’ মহিলা দল

বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর অন্যতম জাতীয়তাবাদী মহিলা দল। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের মহিলা দলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল ২৬৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। অথচ এক বছর আগেই (২০১৮ সালে) মহিলা দলের পরবর্তী কাউন্সিল করার কথা।

২০১৬ সালের পর সাত বছর পেরিয়ে গেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সেই কমিটি দিয়েই এখনও চলছে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল। ফলে বিএনপির শক্তিশালী সহযোগী এই সংগঠনটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ ‘চেতনায় নারী, বিপ্লবে নারী, গণতন্ত্র ফেরাতে আমরাই পারি’- এই স্লোগান ধারণ করে ১৯৭৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি বিভিন্ন সময় নারীদের অধিকার আদায় ও দুঃসময়ে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছিল।


বিজ্ঞাপন


মহিলা দলের কয়েকজন নেত্রী জানান, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থবির হওয়ার পেছনে মেয়াদহীন কমিটি। এছাড়া সাধারণ কর্মীদের সাথে রূঢ় আচরণও দায়ী। তাদের মতে, ৭ বছর আগে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটি হয়েছে। সবাই নতুন কমিটি চায়। দীর্ঘদিন ধরে যারা কষ্ট করে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন তারাও পরিবর্তন চান।

BNPঅভিযোগ রয়েছে, সভাপতি আফরোজা আব্বাস মহিলা দলের কমিটি গঠনসহ সব বিষয়ে একাই সিদ্ধান্ত নেন। আর যোগ্যদের বাদ দিয়ে তার পছন্দের লোকদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে চান। আবার কেন্দ্রীয় মহিলা দলের ৫ নেত্রীকে অব্যাহতি দিয়েছে সংগঠনটি। কিন্তু এই বিষয়ে মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ কিছুই জানেন না।

এদিকে মহিলা দলের কার্যক্রম ও কমিটি গঠন নিয়ে সংগঠনটির সভাপতি আফরোজা আব্বাস এবং সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদের মধ্যে কোন্দল-গ্রুপিং থামছেই না। যতই দিন যাচ্ছে ততই গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের অনুসারীদের মধ্যে কয়েকবার মারামারিও হয়েছে। ফলে নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। আর এই কোন্দলের কারণে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় মহিলা দলের ব্যানারে পৃথক পৃথকভাবেও প্রোগ্রাম করেছেন। এসব প্রোগ্রাম নিয়ে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের সমর্থকদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডাও হয়েছে।

মহিলা দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংগঠনিক মিটিং হয়। ওই সময় সুলতানা আহমেদের সঙ্গে আফরোজা আব্বাসের বাক-বিতণ্ডা হয়। আফরোজা আব্বাসের পক্ষে কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরিন খান সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগানও দেন। এসময় কেন্দ্রীয় মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক শাওন, সাবেক কাউন্সিলর সুরাইয়া, মিতা ও লিজাসহ ২০-৩০ জন কর্মী মহানগর উত্তরের নেত্রী আরজুর ওপর আক্রমণ করেন। পরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে এ ঘটনার সার্বিক বিষয় জানান সুলতানা আহমেদ। কিন্তু ওই ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি।


বিজ্ঞাপন


BNPএদিকে গত ৩০ মার্চ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ১৩৬ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কার্যকরী কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের নতুন এই কমিটি নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে। নতুন কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন পদবঞ্চিতরা। বিভাগীয় ও নগর বিএনপি শীর্ষ নেতাদের দিকে ইঙ্গিত করে বিদ্রোহী নেত্রীরা বলছেন, কিছু ‘স্বার্থপর’ নেতার কারণে কমিটিতে ত্যাগী ও পরিচ্ছন্নদের মূল্যায়ন করা হয়নি। সক্রিয় নেতাকর্মীদের অনেকে বাদ পড়েছেন। অনেকের হয়েছে পদাবনতি।

মহিলা দলের চট্টগ্রাম মহানগর শাখা কমিটি ঘোষণা করার পর অভ্যন্তরীণ কোন্দলও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৪ জনকে শোকজও করেছে কেন্দ্রীয় মহিলা দল।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক মহিলা দলের একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে মহিলা দলের মধ্যে কোন্দল ও গ্রুপিং রয়েছে। যা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। ছাত্রদল থেকে বেড়ে ওঠা কাউকেই মহিলা দলে মূল্যায়ন করা হয় না, অবমূল্যায়ন করা হয়। নিজেদের মধ্যে এসব গ্রুপিং ও কোন্দলের কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

BNPএসব বিষয়ে জানতে চাইলে মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচি চলছে আমরা প্রতিটি কর্মসূচিতেই অংশগ্রহণ করছি। যেখানে যেভাবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সেখানে সেভাবেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আন্দোলন যদি আরও বেগবান হয় আমরাও আরও বেগবান হব। বিএনপির সাথে তালমিলিয়ে আমরাও চলব। জাতীয়তাবাদী মহিলা দল সবসময় ছিল এবং থাকবে। যতদিন এই সরকারের পতন না হবে ততদিন আমরা রাজপথে থাকব ইনশাল্লাহ। ১০ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কারণে আন্দোলন-সংগ্রামে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কারণে আন্দোলন সংগ্রামে প্রভাব পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ আমরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছি। মহানগর উত্তর দক্ষিণ থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশের কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।

আহ্বায়ক কমিটির কারণে চূড়ান্ত আন্দোলনে প্রভাব পড়বে কিনা? জবাবে তিনি বলেন, আমি মনে করি না, আমরা তো তাদেরকে সবসময় সঙ্গে রেখেছি।

BNPবিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিতে মহিলা দল কতটা ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত জানতে চাইলে সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান ঢাকা মেইলকে বলেন, বিএনপির দুঃসময়ে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আশা করছি আগামী দিনে আরও ভালো কিছু করতে পারবে। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কোনো প্রভাব পড়বে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে সবার প্রত্যাশা থাকে পরবর্তী কমিটি হবে। যারা বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে তাদের আশা থাকে আরও ভালো অবস্থানে যাবে। সেক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্ব আসলে ভালো হতো।

নতুন কমিটি হতে বাধা কোথায় জানতে চাইলে হেলেন জেরিন খান বলেন, বাধা কোথাও না, বিএনপির ওপর অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন হচ্ছে। বিএনপি সাধারণ কার্যক্রম চালাতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবে সংগঠনও পরিচালিত হতে পারে না। দেখা যায়, সম্মেলন করতে চাইলাম, নতুন একটা ইস্যু চলে আসল, এতে করে আমাদের সম্মেলনের ডেট পিছিয়ে গেল। দেখা গেল, আমাদের কেউ মামলার মধ্যে পড়ে গেল, তাকে হয়তো গ্রেফতার করা হলো, এরকম নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। আহবায়ক কমিটি হয় স্বল্প সময়ের জন্য এবং প্রত্যেকেরই প্রত্যাশা থেকে একটি সময় শেষে পূর্ণাঙ্গ কমিটি আসবে। সেখানে ব্যাপকভাবে নেতৃত্বের মূল্যায়ন হবে। মনে করি এ বিষয়গুলো আমাদের নীতি নির্ধারকরা গুরুত্ব দেবেন।

এমই/জেএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর