কোন পথে জাতীয় পার্টি

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:৪৭ এএম
কোন পথে জাতীয় পার্টি

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৩ সালে ডিসেম্বরে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে কে থাকবেন তা নিয়ে জাতীয় পার্টিতে শুরু হয়েছে নানা হিসাবনিকাশ। চলছে বহিষ্কার-গ্রুপিং, শক্তি-আস্থার লড়াই। আর এই লড়ায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও সংসদের বিরোধীদলের নেতা এবং পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ।

দুই পক্ষের একই চ্যালেঞ্জ আগামী নির্বাচনে তারা কোন পক্ষের সঙ্গে সুর মেলাবে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে, নাকি সরকার বিরোধীদের সঙ্গে? নাকি নিজেদের মতো করে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে? তবে অনেকেই মনে করেন, দলটি নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে। যাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখবে, শেষমেশ তাদের দিকেই ঝুঁকবে দলটি।

জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ তাদের পাল্লাভারী করতে দলের হেভিওয়েট নেতাদের পক্ষে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত চালাচ্ছেন চেষ্টা তদবির। এর ফলে প্রতিনিয়ত চলছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য-বিবৃতি। বিভিন্ন অভিযোগে ঘটছে বহিষ্কারের ঘটনাও। আর এ দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে দুশ্চিন্তায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও। দুই পক্ষই যোগাযোগ রেখে চলছে সরকারপক্ষের সঙ্গে।

আশির দশকের শেষ দিকে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে রীতিমতো টেক্কা দিয়েছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা)। তবে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদের পতনে ভাঙন ধরে জাতীয় পার্টিতে। কেউ যান বিএনপিতে, কারও ঠাঁই হয় আওয়ামী লীগে। একপর্যায়ে জাপা ভেঙে হয় চার ভাগ। তবে রাজনীতির মাঠে বরাবরই দাপট দেখিয়েছে এরশাদের নেতৃত্বাধীন মূল জাপাই। ১৯৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংসদীয় আসনে জয়ের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে ছিল জাপা। ২০০৮ সালে দলটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোট সরকার গঠন করে। আর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় জাপা। ২০১৯ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মারা যান। দলের হাল ধরেন তার ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের। পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হন রওশন এরশাদ। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতাও হন এরশাদপত্নী।

gm-quader

সাম্প্রতিক সময়ে আবারো ভাঙনের মুখে জাপা। এবার ভাঙনের শুরু জিএম কাদেরকে বাদ দিয়ে রওশনের পার্টির দশম সম্মেলনের আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া নিয়ে এবং রওশন এরশাদকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার পদ থেকে সরিয়ে জিএম কাদেরকে বসানোর চেষ্টা থেকে।

এ ইস্যুতে প্রকাশ্যে মন্তব্য করায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর মসিউর রহমান রাঙ্গাকে পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তাকে অব্যাহতি দেন। সেই আদেশ এরই মধ্যে কার্যকরও হয়েছে। অথচ রাঙ্গা বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ। তিনি দলটির সাবেক মহাসচিব ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি। ফলে রাঙ্গার অব্যাহতি ঘিরে চলছে দুই পক্ষের কথা চালাচালি। এরই মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ও অব্যাহতি পাওয়া রাঙ্গা।

মুজিবুল হক চুন্নুর অভিযোগ, সংগঠনবিরোধী কার্যক্রমের কারণে রাঙ্গাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিছুদিন ধরে তিনি জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন ফোরামে দলের স্বার্থবিরোধী কথাবার্তা বলেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দু-তিন মাস আগেও রাঙ্গা দল থেকে অব্যাহতির কথা চিন্তা করেছিলেন পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তবে সেসময় ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে যান রাঙ্গা।

rawsan

অপরদিকে, মসিউর রহমান রাঙ্গা বলছেন, রওশন এরশাদকে সরিয়ে জিএম কাদেরকে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা করতে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তার প্রক্রিয়া সঠিক ছিল না। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে এমন বক্তব্য দেওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।

জাতীয় পার্টি সূত্রে জানা যায়, জাপার সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবিত থাকাকালীন তার হাতেই ছিল দলটির নিয়ন্ত্রণ। তারা মৃত্যুর পর রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের নেতৃত্বে চলছিল পার্টি। তবে এখন এককভাবে দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় দুজনই। এক পক্ষ সরকারের সঙ্গে থাকতে চায়। অন্য পক্ষ বলছে সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলে তবেই তারা তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন।

জি এম কাদেরের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এখন কথা বলছেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ। দলের মধ্যে ভিন্ন তৎপরতায় নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন তিনি। সরকারের সুদৃষ্টিতে থাকায় তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন।

japa

অন্যদিকে, রওশনের অনুসারীদের উদ্দেশে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলে আসছেন, কেউ দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করলে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। ‘শৃঙ্খলা ভাঙার’ অভিযোগে ইতোমধ্যে পার্টির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙাকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এরপর গত শনিবার জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি জিয়াউল হক মৃধাকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও রাঙাকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের পদ থেকেও বাদ দেওয়া হতে পারে তাকে। বাদ পড়লেও তাদের রওশনের এরশাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজনৈতিক সূত্র বলছে, বিএনপি নেতাদের সঙ্গে জি এম কাদেরসহ শীর্ষ নেতারা বৈঠক করেছেন। আর এমন খবরে রওশন এরশাদ খুব বিরক্ত। এই নিয়ে ‘দ্বিধা-বিভক্ত’ জাপা। তবে রওশনপন্থীরা এবারও আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকতে চাইছে। তারা মনে করেন, এবারও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সরকার গঠন হবে। ফলে তিনি আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকতে চান। তবে আগামী কাউন্সিলে নেতৃত্ব বদল হলেও জাপার উভয়পক্ষ (রওশন-কাদের) বিগত দিনের মতোই ক্ষমতায় থাকার পক্ষপাতী।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩শ আসনে প্রার্থী দেবে এমনটাই সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ লক্ষ্যে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের নেতৃত্বে সারাদেশে কাজ চলছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনো সময় আছে। নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি কি হবে সেটার উপর নির্ভর করবে।

সম্প্রতি পার্টির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বিষয়ে তিনি বলেন, পার্টি পরিচালনায় একটি গঠনতন্ত্র রয়েছে। এর পরিপন্থী হলে তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে গঠনতন্ত্র মোতাবেক।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও রওশনের ডাক দেওয়া পার্টির দশম সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মামুনুর রশীদ ঢাকা মেইলকে বলেন, জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করে প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে কেউ দায়িত্ব নিলে সংগঠন আরও ভালো চলবে। তাতে সাময়িক কিছু অসুবিধা হলেও সময়ের ব্যবধানে ঠিক হয়ে যাবে। সেদিক বিবেচনায় রওশন এরশাদই পারফেক্ট। যেহেতু তার শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে।

তিনি বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান (জিএম কাদের) পার্টিকে ভাঙ্গনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি শিক্ষিত মানুষ আশাকরি শুভবুদ্ধির উদয় হবে। জাতীয় পার্টি আরও শক্তিশালী হবে।

টিএ/এএস