সিলিন্ডার গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
রোববার (৮ নভেম্বর) বিকেলে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট থেকে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের উদ্যোগে মিছিলটি বের হয়।
বিক্ষোভপূর্ব সমাবেশে সংগঠনটির নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির অভিযোগ করেন।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, সরকার তেল-গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের নামে বারবার দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও সরকার ভর্তুকি দিয়ে দাম অপরিবর্তিত রাখার কথা জানিয়েছিল। সংসদ ও গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রচারও চালানো হয়েছিল। কিন্তু এর পরপরই তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাসের দাম কমলেও বাংলাদেশে বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীরা জনগণের কাছে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করছেন।
দেশজুড়ে সারের সংকট প্রসঙ্গ তুলে নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। অথচ কৃষিমন্ত্রী দাবি করছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের নামে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সাজানো প্রশ্নের মাধ্যমে সারের সংকট আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একদিকে সারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই, অন্যদিকে দলীয়করণের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ দিয়ে হাজার টাকার সারের বস্তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এভাবে জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার দাবি করছে, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের এলাকায় সারের সংকট রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সরকার কি বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দিচ্ছে না? প্রতি ইউনিয়নে একজন করে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলেও এসব পদে বিএনপির দলীয় লোকজনকে বসানো হয়েছে। এমনকি সংসদ সদস্যদের স্ত্রী, ছেলে ও পুত্রবধূকেও ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সারের সংকটে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে দাম বাড়ছে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে নৈরাজ্য চলছে উল্লেখ করে জামায়াতের এ নেতা বলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, দেশে কোনো সরকার নেই। জনগণের মুক্তির জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের আট দফা দাবি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। এসব দাবি আদায় হলে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ তৈরি হবে।
সমাবেশে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেনের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও মহানগরীর নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, সরকার একদিকে দফায় দফায় তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে এসব পণ্যের সংকটও রয়েছে। কৃষক সার পাচ্ছেন না, মানুষ প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। চারদিকে শুধু সংকট আর সংকট।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, অন্তর্র্বতী সরকারের সময় বিএনপি বলেছিল, নির্বাচনই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরও সংকট কমেনি, বরং বেড়েছে। অন্তর্র্বতী সরকারের দুই বছরে মানুষকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি, বিএনপি সরকারের সময়ে কেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, বিএনপি সরকার সবকিছুর দাম বাড়ালেও মানুষের জীবনের মূল্য কমিয়ে দিয়েছে।
বাজারের সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু বাজারের সিন্ডিকেট নয়, প্রধানমন্ত্রীও সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছেন। এর কারণে তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর হাতে নেই, বরং বিএনপির অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট সরকার পরিচালনা করছে। জনগণের সরকার হলে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি বলেন, সরকারের ব্যর্থতার তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলীয়করণের কারণে সরকারের ব্যর্থতা বাড়ছে। এসব বন্ধে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিন্ডিকেটের কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। ক্ষমতায় গেলে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের আট মাসে সিন্ডিকেট ভাঙার পরিবর্তে তা আরও বেড়েছে।
একই সংগঠনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি বলেন, সরকার সব ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জনগণের দুর্ভোগ কমানোর পরিবর্তে তা আরও বাড়াচ্ছে। দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের সুবিধা দিতে দফায় দফায় তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে নিত্যপণ্যের দামও বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি সাদিক কায়েম বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, নির্বাচন হলে সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু নির্বাচনের আট মাস পরও সরকার রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি। এ সময়ে তিনবার তেল-গ্যাসের দাম এবং দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না, সর্বত্র সংকট বিরাজ করছে। রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে পল্টন মোড় হয়ে কাকরাইল মোড়ে যায়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে মিছিল শেষ হয়। এতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা অংশ নেন।
টিএই/এএইচ



