সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সাইবার সুরক্ষা আইনে বিরোধী দল ও সাংবাদিকদের হয়রানির আশঙ্কা জামায়াতের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

‘সাইবার সুরক্ষা আইনে বিরোধী দল ও সাংবাদিকদের হয়রানির আশঙ্কা’
প্রেসক্লাবে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬: নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছেন গোলাম পরওয়ার

সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারার অপব্যবহার করে বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের হয়রানি করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। 

তিনি বলেন, ‘আইনে গুজব, অসত্য তথ্য, মানহানি, তল্লাশি ও জব্দের মতো বিষয়গুলোর ব্যাখ্যায় অস্পষ্টতা রয়েছে। এসব বিধান ব্যবহার করে বিরোধী দল ও সাংবাদিকদের আটক এবং শাস্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের দ্বিতীয় তলায় জহুর হোসেন চৌধুরী হলে জামায়াতে ইসলামীর তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬: নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ নাকি বাকস্বাধীনতা দমন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পরওয়ার।

তিনি বলেন, ‘অতীতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৫৭ ধারায় জামিন অযোগ্য অপরাধ ও কঠোর শাস্তির বিধান ছিল। পরবর্তী সময়ে এসব আইনের বিভিন্ন দমনমূলক ধারা পরিবর্তন করা হলেও নতুন আইনে আবারও একই ধরনের বিধান রাখার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’

জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইনের দমন-পীড়নমূলক ধারাগুলো বাদ দিয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ প্রণয়ন করেছিল। পরে বর্তমান সরকার ওই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এত দ্রুত নতুন করে সংশোধনের প্রয়োজন কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সংসদে আইনটি উত্থাপনের পর মাত্র ১০ দিনের মধ্যে জনমত চাওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন নিয়ে জনগণের মতামত গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত। আইনটি নিয়ে জনমত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ধারার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আইনের ২৬ ও ৩৪ ধারায় মানহানি, গুজব, অসত্য তথ্য, তল্লাশি ও জব্দের মতো বিষয়গুলোর ব্যাখ্যায় অস্পষ্টতা রয়েছে। এসব বিধানের অপব্যবহার করে বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গুজব, অপতথ্য, ভুল তথ্য ও ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো মিথ্যা তথ্যের সংজ্ঞা স্পষ্ট না থাকলে আইনের প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’

পরওয়ার বলেন, ‘জামিন অযোগ্য ধারাগুলো বাতিল করা উচিত। বিদ্যমান আইনে যেসব বিধান রয়েছে, সেগুলো বহাল রেখে নতুন করে আরও নিয়ন্ত্রণমূলক বিধান যুক্ত করার প্রয়োজন নেই। সরকারের উচিত প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রত্যাহার করে বিদ্যমান আইনটি কার্যকর রাখা।’

অতীতের রাজনৈতিক মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেফতারের বিষয়টি স্মরণ করা প্রয়োজন।’

তার দাবি, তাদের বিরুদ্ধে প্রথমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল, পরে যুদ্ধাপরাধের মামলা করা হয়। এ অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আইন যতই ভালো হোক, সেটি প্রয়োগ করেন মানুষ। প্রয়োগকারীর মধ্যে স্বেচ্ছাচারি ও কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা থাকলে আইনকে অপব্যবহার করে নিরীহ মানুষকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব। তাই আইনের পাশাপাশি নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও আইনের শাসনের চর্চা জরুরি।’

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘নাগরিক জীবনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। শুধু আইন করে সমাজের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়, শিশুদের নিরাপত্তা ও সামাজিক অপরাধের মতো বিষয়গুলোতেও সরকারের যথাযথ নজর দেওয়া প্রয়োজন।’

সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের গঠন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের সেক্রেটারি। তিনি বলেন, ‘এ কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা থাকলেও সাংবাদিকদের প্রতিনিধি এবং সংসদের বিরোধী দলের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। অথচ গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন।’

পরওয়ার আরও বলেন, ‘সাংবাদিক ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠন করা হলে তা একদলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা তৈরি করবে। আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন লেখক ও প্রবীণ সাংবাদিক আবুল আসাদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান রফিকুজ্জামান রুমান।

সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল হক জুবায়ের, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদসহ অনেকে।

এএইচ/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর