সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে সিন্ডিকেট বাতিলের দাবি এবি পার্টির

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১২ পিএম

শেয়ার করুন:

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে সিন্ডিকেট বাতিলের দাবি এবি পার্টির
মজিবুর রহমান মঞ্জু। ছবি: সংগৃহীত

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠাতে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা বাতিল করে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কাজের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবীর মিলনায়তনে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনা সভায় এ দাবি জানানো হয়।

‘মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি: সিন্ডিকেট, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সভায় বক্তারা বলেন, স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের বাইরে শ্রমিকদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না। তাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের সদস্য পরিবর্তন হলেও জনশক্তি রপ্তানির কাঠামোগত অনিয়ম দূর হয়নি।

এবি পার্টির ছায়া সরকারবিষয়ক সমন্বয়ক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমানের সঞ্চালনায় সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।

সভাপতির বক্তব্যে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, একটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে লাইসেন্স দেওয়ার আগে সরকার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এত যাচাই-বাছাইয়ের পর লাইসেন্স দেওয়া হলেও এজেন্সিগুলো কাজের সুযোগ না পেলে লাইসেন্স দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?

তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সব লাইসেন্সধারী এজেন্সিকে কাজের সুযোগ দিতে হবে। সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের বাইরে কোনো টাকা নেওয়া যাবে না।’

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে মঞ্জু বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থে সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

image

বিদেশে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক এজেন্সি ইতিমধ্যে ভাইভা নেওয়া শুরু করেছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শ্রমিকদের স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, নির্দিষ্ট ২৫টি কোম্পানির মধ্যে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সীমাবদ্ধ না রেখে তা উন্মুক্ত করা হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার খরচও কমবে।

তিনি বলেন, শ্রমিকেরা যাতে সহজে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ও কম খরচে বিদেশ যেতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ‘ধান্দাবাজদের’ দেশ থেকে দূর করার আহ্বান জানান তিনি।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, প্রবাসী শ্রমিকেরা সামান্য আয়ের জন্য অসহনীয় কষ্ট করেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম মানবিকতাও দেখা যায় না।

তিনি বলেন, ‘প্রবাসী শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে না দেখে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলে শুধু গর্ব করলেই হবে না, তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।’

দাতু আমিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের খবরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করে ফুয়াদ বলেন, প্রবাসীদের নিয়ে কোনো ধরনের ছিনিমিনি খেলা মেনে নেওয়া হবে না। ২৫ কোম্পানির সিন্ডিকেট অবিলম্বে বাতিল করে কম খরচে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, দেশের শ্রমিকেরা জমি বিক্রি করে বিদেশে যান এবং অমানবিক পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠান। মালয়েশিয়াতেও বাংলাদেশি শ্রমিকেরা কঠোর পরিশ্রম করছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোকে কেন্দ্র করে আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় করা হয়েছে। কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ১৭টি কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তার জবাব দিতে হবে।

মোমেন প্রশ্ন করেন, জনগণের সরকার হলে কেন সিন্ডিকেটের কাছে মাথানত করতে হবে? নেপাল ও ফিলিপাইন নিজেদের অবস্থান থেকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না?

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এখনো বহাল থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও তা পূরণ হয়নি। বরং বর্তমান নীতিমালায় সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব নুরুল আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শহীদ জিয়াউর রহমানের সন্তান হিসেবে তিনি আশা করেন, প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবেন এবং অতীতের সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ৫ আগস্টের আন্দোলনে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ রেখে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন।

তিনি বলেন, শ্রমিকেরা বিদেশে গিয়ে ঘাম ঝরিয়ে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠান। অন্যদিকে ধনীদের সন্তানরা বিদেশে পড়তে গিয়ে দেশের অর্থ বিদেশে নিয়ে যান। গরিবের সন্তানরাই দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন।

শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে রিপন বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে শ্রমিকদের স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ৫ আগস্টের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সিন্ডিকেটমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

স্বাগত বক্তব্যে এবি পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াহাব মিনার বলেন, জীবিকার তাগিদে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে যায়। মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও পুরোনো সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তিনি শ্রমিকদের স্বার্থে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সাংবাদিক রাজীব আহমেদ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, গণমাধ্যমে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম এবং প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেন।

সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ, পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম ও নুরুল আমিন এবং সাংবাদিক রাজীব আহমেদ বক্তব্য দেন।

সভায় এবি পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, শ্রমিক নেতা ও প্রবাসী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর