সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদ থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। সময়ের পরিক্রমায় প্রতিষ্ঠার চারদশক পেরিয়ে বিএনপি এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল। সবশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় জিয়াউর রহমানের জাগদল থেকে বিএনপিতে রূপান্তর হওয়া দলটি। যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারই বড় ছেলে তারেক রহমান।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক যাত্রায় ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা, গণভোট, অসামরিক উপদেষ্টাদের যুক্ত করা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) ও জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠনের মতো একাধিক ধাপ ছিল। নতুন এই দলে বাম, ডান ও মধ্যপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষকে যুক্ত করার পাশাপাশি রাজনীতিতে ৪৫ শতাংশ নতুন ও তরুণদের সামনে আনা হয়েছিল।
১৯৭৬ সালের মে মাসে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় জিয়াউর রহমান নিজেকে ‘একজন শ্রমিক’ হিসেবে পরিচয় দেন। এর পরের বছর ৩০ এপ্রিল তিনি ‘আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়’ নিয়ে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচিতে উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই কর্মসূচিই পরে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এরপর ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৮ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ জিয়ার পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। গণভোটের পর জিয়াউর রহমান তার উপদেষ্টা অসামরিক ব্যক্তি যুক্ত করেন।
একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়া। দল গঠন প্রক্রিয়া একাধিক ব্যক্তি ও মাধ্যমকে কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশুর দফতরে রাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের যাতায়াত ছিল এবং মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতেন জিয়াউর রহমান।
আর তার একান্ত সচিব কর্নেল অলি আহমদও মাঠপর্যায়ের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
প্রথমে জাগদল, পরে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট জিয়াউর রহমান সরাসরি নিজের নামে রাজনৈতিক দল গঠনের আগে একটি অনুগত রাজনৈতিক শক্তি তৈরির উদ্যোগ নেন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগদল)। তবে দলটি রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের সাড়া ফেলতে পারেনি।
পরবর্তীতে ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে গঠন করা হয় ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী এতে যুক্ত হয়। এর কিছুদিন পর ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
জিয়াউর রহমান গ্রামে গ্রামে জনসংযোগ রাজনীতিতে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনতেন। এর মাধ্যমে সামরিক শাসক হিসেবে দূরের কোনো ব্যক্তি না হয়ে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি একজন নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক বক্তৃতা ও জনসংযোগও আরও সাবলীল হয়ে ওঠে জনগণের মাঝে।
১ সেপ্টেম্বর বিএনপির আত্মপ্রকাশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের অভিজ্ঞতার পর জিয়া একক রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। দলের গঠনের জন্য তিনি বিভিন্ন জনের আলোচনা করেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি প্রথমে দলের নাম ‘জাস্টিস পার্টি’ রাখার প্রস্তাব দেন। কিন্তু নাম পছন্দ না হওয়া তা গ্রহণ করেনি তিনি। জিয়াউর রহমান মনে করতেন দলের সঙ্গে ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটা থাকা জরুরি। পরে নিজেই ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ নাম চূড়ান্ত করেন। এরপর ১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট ‘জাগদল’ বিলুপ্তির ঘোষণা দেন।
ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করে জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। প্রথমে ১৮ জন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ৭৬ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন তিনি। জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে প্রধান তিনটি প্রস্তাব ছিল-বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং সার্বিক শক্তিশালী করা।
বিএনপির গঠনতন্ত্র তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ৯ জন। তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছাড়া যুক্ত ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, নাজমুল হুদা, মওদুদ আহমদ এবং ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী অন্যতম। বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন দলের প্রথম মহাসচিব।
যদিও জিয়াউর রহমানের বিএনপি গঠনে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের যেসব সহযোদ্ধা ছিলেন তারা কেউ বেঁচে নেই।
বিইউ/এমআই





