রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

২৪১ নেতাকর্মীর গুমের বিচার ও নিখোঁজ ৭ ছাত্রনেতার সন্ধান দাবি শিবিরের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

২৪১ নেতাকর্মীর গুমের বিচার ও নিখোঁজ ৭ ছাত্রনেতার সন্ধান দাবি শিবিরের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন

গুমের শিকার ২৪১ নেতাকর্মীর বিচার এবং এখনও নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতার সন্ধান দাবি করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে সংগঠনটির পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুর ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। 

অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালে তৎকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে গুম বা ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), ডিজিএফআই, র‍্যাব ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত বাহিনীকে ব্যবহার করে এসব গুমের ঘটনা ঘটানো হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন নেতাকর্মী ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয় থাকা মোট ভুক্তভোগীর ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশই ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, এই সংখ্যা গুম কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের করা তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে। তবে গত দেড় দশকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর সংঘটিত প্রকৃত গুমের ঘটনা সাত শতাধিক। নির্যাতনের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং নিরাপত্তার কারণে দেশের বাইরে চলে যাওয়া অনেক গুমফেরত ব্যক্তির তথ্য এখনও পুরোপুরি হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা কমিশনের প্রতিবেদনের চেয়েও বেশি বলে দাবি করেন তিনি।

নূরুল ইসলাম আরও বলেন, তৎকালীন নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মিথ্যা মামলায় ছাত্রশিবিরের ১৭ হাজার ৪৬৩ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এসব মামলার সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৮২৬টি। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে গত দেড় দশকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার আব্দুল্লাহ ওমর নাসিব শাহাদাত, ইবনুল ইসলাম পারভেজ, আনিসুর রহমান, আল মাহমুদ, আবু জর গিফারী, শামীম মাহমুদ, হাফেজ মো. জসিম উদ্দীন জিহাদ, মহিউদ্দিন সোহান ও মো. মাইদুল ইসলামের ওপর নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়।

এ ছাড়া তৎকালীন জয়পুরহাট জেলা সভাপতি আবু জর গিফারী ও সেক্রেটারি ওমর আলীর পায়ে গুলি করে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন ছাত্রশিবির সভাপতি।

এখনো নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতার বিষয়ে নূরুল ইসলাম বলেন, ‘২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর ইতোমধ্যে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক অর্থ সম্পাদক মো. ওয়ালীউল্লাহ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল মুকাদ্দাস, আদাবর থানা সভাপতি হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোল থানা সেক্রেটারি রেজওয়ান, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মু. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজার থেকে গুম হওয়া শফিকুল ইসলামসহ সাতজন নেতাকর্মীর কোনো সন্ধান রাষ্ট্র দিতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা অবিলম্বে এই সাতজনের বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং তাদের সন্ধান দাবি করছি।’

সংবাদ সম্মেলন থেকে গুমের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণসহ ছয় দফা দাবি জানানো হয়।

ছাত্রশিবিরের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গুম কমিশনে দায়ের করা ২৪১ নেতাকর্মীর গুমের ঘটনাসহ সাত শতাধিক গুমের ঘটনা এবং এখনও নিখোঁজ সাত ছাত্রনেতাসহ সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করা।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত গুম ও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কমান্ডারদের আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানানো হয়।

নিখোঁজ ছাত্রনেতাদের অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট জবাব, গুমের শিকার ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ ও ‘র‍্যাব সংক্রান্ত বিল’ চূড়ান্তভাবে আইন হওয়ার আগে সংশোধন করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

একইসঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’-এর বাইরে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সংস্থার হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ, দাওয়াহ সম্পাদক হাফেজ আবু মুসা, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক রেজাউল করিম শাকিল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, স্পোর্টস সম্পাদক মুশফিকুর রহমান এবং শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পাদক জাকির হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া গুমের শিকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আল মুকাদ্দাসের পিতা মাওলানা আব্দুল হালিম, হাফেজ জাকির হোসেনের ভাই জিয়াউর রহমান, রেজওয়ান হোসেনের বড় ভাই রিপন হোসেন, গুম করে ক্রসফায়ারে নিহত মহিদুল ইসলামের ভাই শহিদুল ইসলাম এবং পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়া ছাত্রশিবিরের সাবেক জয়পুরহাট জেলা সভাপতি আবু জর গিফারীসহ ভুক্তভোগী ও পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে নূরুল ইসলাম সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, গুম হওয়া সাতজনের পরিবার এখনো তাদের প্রিয়জনের অপেক্ষায়। সাংবাদিকদের লেখনীর মাধ্যমে এসব পরিবারের দীর্ঘশ্বাস ও আর্তনাদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

টিএই/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর