ক্ষমতা, অর্থ কিংবা হুমকির কাছে মাথা নত না করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তুলে ধরাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, একটি সমাজ ও রাষ্ট্র যখন সংকটের মুখে পড়ে, তখন বিবেকবান ও শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। সাংবাদিকদেরও সেই দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত না হয়ে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করে যেতে হবে।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) মিলনায়তনে প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম আব্দুস সালামের ১২৫তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী এসব কথা বলেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, যারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তারা শুধু রাষ্ট্রের স্বাধীনতার কথা বলেন না, মানুষের স্বাধীনতা ও নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষেও অবস্থান নেন। ইতিহাসে দেখা গেছে, এমন স্বাধীনচেতা মানুষকে বিভিন্ন সময়ে নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। সাংবাদিক আব্দুস সালামের জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়।
আব্দুস সালামের সাংবাদিকতা জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের সময়ও তিনি ভাষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ কারণে তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনীতিতেও যুক্ত হন এবং যুক্তফ্রন্টের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে রাজনীতিতে যুক্ত থাকার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গেও তার সম্পর্ক অব্যাহত ছিল।
রিজভী বলেন, জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আব্দুস সালাম সাংবাদিকতার দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। বিভিন্ন সময়ে ছোটখাটো চাকরি করে সংসার চালিয়েছেন। পরে আবার সাংবাদিকতায় ফিরে এসে অবজারভার পত্রিকায় কাজ করেন। কিন্তু সেখানেও তার নিগ্রহের শেষ হয়নি।
আইয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বইয়ের সমালোচনা করে আব্দুস সালামের লেখা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, তিনি ওই বইয়ের কঠিন সমালোচনা করেছিলেন। এর পরদিনই অবজারভার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সামরিক শাসন হোক কিংবা সীমিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ, স্বাধীনচেতা সাংবাদিকদের ওপর বিভিন্ন সময়ে চাপ ও আক্রমণ এসেছে।
সাংবাদিকতার সঙ্গে সক্রিয়তার সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা শুধু ডেস্কে বসে লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সমাজ ও রাষ্ট্র যখন বিপদের মুখে পড়ে, ধ্বংসের বার্তা আসে, তখন একজন বিবেকবান শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো সেই বিপদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। আব্দুস সালাম সেই দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিএনপির শীর্ষ নেতা বলেন, আব্দুস সালাম একের পর এক আঘাত পেয়েছেন, কিন্তু নিজের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি যখনই সাংবাদিকতায় ফিরে এসেছেন, তখনই স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং সাংবাদিকতার কারণে তিনি শুধু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান নয়, দুই পাকিস্তান মিলে গঠিত এডিটরস কাউন্সিলের সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বর্তমান সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, সময়ের সঙ্গে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা বিশ্বজুড়েই কমে যাচ্ছে। একসময় সাংবাদিকরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতেন। কোনো অর্থ, হুমকি কিংবা ক্ষমতার কাছে তারা মাথা নত করতেন না। আব্দুস সালাম ছিলেন সেই ধারার সাংবাদিকতার অন্যতম প্রতীক।
মিডিয়ার ওপর ক্ষমতার প্রভাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বৈরাচারি শাসনে জনগণকে দমন করার জন্য ডান্ডা-লাঠি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যাদের মধ্যে স্বৈরাচারী মানসিকতা রয়েছে, তারা মিডিয়াকে সেই লাঠির মতো ব্যবহার করে। বিভিন্ন ধরনের প্রচারব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও মন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
ভারতের গণমাধ্যম পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে রিজভী বলেন, সেখানে ‘গোদি মিডিয়া’ বলে একটি শব্দ চালু হয়েছে। একসময় যে সমাজে স্বাধীনচেতা ও মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব ছিল, সেখানে এখন গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ শাসকপক্ষের অনুগত হয়ে পড়েছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এ ধরনের প্রবণতা বাড়ছে। নীতিনির্ধারকেরা যখন গণমাধ্যমকে জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের এই প্রচেষ্টা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তিনি বলেন, আব্দুস সালামের মতো স্বাধীনচেতা সাংবাদিক শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্য প্রয়োজন। সত্য ও মিথ্যার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানতে হলে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। এ ধরনের সাংবাদিকতার পুনর্জাগরণ ঘটলে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশে দেশে সংঘাত, যুদ্ধ ও সহিংসতার পথও সংকুচিত হবে।
রিজভী আরও বলেন, সাংবাদিকতার পেশাকে শুধু জীবিকা হিসেবে দেখলে চলবে না। সত্য প্রকাশ এবং মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্বও সাংবাদিকদের নিতে হবে। ক্ষমতা কিংবা কোনো ধরনের চাপের কাছে সাংবাদিকতার মূল আদর্শ বিসর্জন না দিয়ে বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়াই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত দায়িত্ব।
আব্দুস সালামের ১২৫তম জন্মদিনের এই আয়োজনকে তার সাংবাদিকতা ও জীবনাদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন বক্তারা। তারা বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার যে মূল্যবোধ আব্দুস সালাম ধারণ করেছিলেন, বর্তমান সময়ে সেই মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
এএইচ/এএইচ




