দেশে ‘বাংলাদেশ জনরাষ্ট্র আন্দোলন’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। সোমবার (৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে দলটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। উদ্যোক্তারা বলছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির যোদ্ধাদের উদ্যোগে মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেরণায় দলটির আত্মপ্রকাশ করেছে।
আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলটির সম্পাদক হিসেবে মুহাম্মদ উল্লাহ মধু এবং মুখপাত্র হিসেবে ইকবাল হোসেনের (সাম্য শাহ) নাম ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি ৩৭ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কমিটিও ঘোষণা করা হয়। এতে ২১ জন সংগঠক এবং ১৪ জন সদস্য রয়েছেন।
সংগঠনটির ভাষ্য, জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। সেই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্ল্যাটফর্ম হতে চায় ‘বাংলাদেশ জনরাষ্ট্র আন্দোলন’। দেশের সব দেশপ্রেমিক নাগরিককে এ উদ্যোগে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘দেশের সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু তারুণ্য। এখনো দেশের মানুষ তরুণদের দিকেই আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব রয়েছে।’
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। দেশের রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির প্রভাব ও হস্তক্ষেপের আশঙ্কা এখনো বিদ্যমান।’ এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে সবার অংশগ্রহণে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘একটি পক্ষ গালাগালি ও বিদ্বেষকে রাজনীতির অংশে পরিণত করতে চায়, যা তরুণদের বিপথগামী করছে। বাংলাদেশ জনরাষ্ট্র আন্দোলনের সংগঠকদের এ ধরনের নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে তরুণদের বের করে এনে আলোর পথ দেখাতে হবে এবং ইতিবাচক ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে হবে।’
অনুষ্ঠানে গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ মোহসিন রশিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জনরাষ্ট্র আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা
দলটির সম্পাদক ও মুখপাত্র ছাড়া সংগঠকরা হলেন—
১. মোশাররফ হোসেন
২. এম এ আলিফ
৩. শাহ আলম
৪. আলিয়া ছোঁয়া
৫. মেহেদী হাসান বাবু
৬. ইমতিয়াজ হোসাইন লিটন
৭. সেলিম হোসেন
৮. আমান উল্ল্যাহ্ ফারাবী
৯. জহিরুল ইসলাম শাকিল
১০. নাঈম হামিদ পৃথু
১১. নাজমুস সাকিব
১২. শাওন রহমান
১৩. শফিকুর রহমান মোল্লা
১৪. তামিম আহম্মেদ তুরাগ
১৫. এইচ এম নাইমুল
১৬. জাহাঙ্গীর আলম সবুজ
১৭. আরিফুল ইসলাম
১৮. ইয়াসিন হাসান
১৯. কাইফা জামান
২০. সুমাইয়া নাসরিন আশা
২১. ইয়ামিন হাসান রন
সদস্যরা হলেন—
১. সর্দার আমিরুল ইসলাম
২. মারিয়া রিমা
৩. ব্যারিস্টার রিজভী
৪. ক্যাপ্টেন রেদওয়ান সিকদার
৫. সিদ্দিকুর রহমান
৬. সাব্বির আহাম্মদ
৭. অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম
৮. প্রাচ্য মোহাম্মদ
৯. শরীফ আকন্দ
১০. শাহিদুল ইসলাম চৌধুরী
১১. আহম্মেদ রন
১২. রবিউল ইসলাম রবি
১৩. মাহমুদ হাসান লাবলু
১৪. অ্যাডভোকেট প্রিয়াঙ্কা আখতার
জনরাষ্ট্র আন্দোলনের ঘোষণাপত্র
ইতিহাসের এক অনিবার্য মর্মর সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের সুদৃঢ় রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার আনুষ্ঠানিক রূপরেখা ঘোষণা করছি। এই যাত্রা কোনো সাময়িক ক্ষমতার মোহ, নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার নগ্নতা কিংবা প্রচলিত রাজনৈতিক বলয়ের অংশীদারত্বের কূটকৌশল নয়। এই ঘোষণা ইতিহাসের চরম বাস্তবতার স্পষ্টত দায় স্বীকার এবং জাতির কাছে আমাদের সহজ সরল সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
আমরা শ্রদ্ধার সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণ করছি। স্মরণ করছি এক নদী রক্তের স্রোতে জুলাইয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আত্মদানকারী আমার আপনার ভাই বোন এবং সন্তানহারা মায়ের অশ্রুজল। আমরা বিশ্বাস করি, ২০১৮ সনের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ছিলো স্পষ্টতই চব্বিশ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের টেকশই ভিত্তি। মোটা দাগে তরুণ সমাজের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং রাজপথের সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রতিরোধই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক পটভূমি। আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সময়ের দমন-পীড়ন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর যুগপৎ লড়াই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে জুলাই অভ্যুত্থানের আবহ তৈরি করেছে।
নদী-বিধৌত বাংলাদেশের পলিমাটির চিরন্তন শক্তি জানান দেয় হাজার হাজার বছরের পৃষ্ঠাজুড়ে ঐতিহাসিক সংস্কৃতির সুড়োল শব্দ-বাক্যের বাংলা উচ্চারণে আমার-আপনার বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব। আমরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ববাদে বিশ্বাস করি। বিপ্লব বিদ্রোহে আমাদের জনসাধারণগণ-কৃষকের ত্যাজি তাগড়া বাহু বলে শোষণের শৃঙ্খল মুক্তি জানান দেয় শতাব্দীর পর শতাব্দীর উজ্জ্বল ক্যালেন্ডার।
বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ববাদে একনিষ্ঠ আস্থা ঘোষণার মধ্যে দিয়ে আমাদের সংস্কৃতির বিশালতা, গভীরত্ব বোধ ও ভাষা আর বর্ণমালার সৌহার্দ্যময় ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রীয় গৌরবের মূল ভিত্তি বিবেচনা করে আমরা ধারণ করি মহান মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষাকে। আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, এই মাটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামে আমাদের অনুসরণীয় বীরদের বীরত্বগাঁথা এবং বীর শহিদদের প্রতিফোটা রক্তের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় ঐক্যের মূল চালিকাশক্তি।
সাম্প্রদায়িক চিন্তার বাইরে অসাম্প্রদায়িকতা সমাজ তথা রাষ্ট্র ধারণা লালন, ধর্মীয় স্বাধীনতা, বর্ণ-গোত্র ও জাতিগত স্ব স্ব পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত অঙ্গীকারের মধ্যে দিয়ে নাগরিক নিরাপত্তার সাথে গণতন্ত্র, বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ চর্চা সমুন্নত রেখে স্বচ্ছ জবাবদিহিমুলক কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিশীল রাজনীতির দিকে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা গণতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি। এবং শোষণমুক্ত অর্থনীতির পাক পর্বে জনশক্তির টেকশই ভিত্তি তৈরির মাধ্যমে দক্ষ শ্রম ভান্ডার এবং উৎপাদনমুখি জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূরকরণের মধ্যে দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার গণমুখি রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলি।
১৯৪৭ রাষ্ট্র গঠনের অসমাপ্ত অধ্যায়, ২০২৪ এর রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের প্রেরণা এবং ১৯৭১'র সনের মহান মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার উপলব্ধি এখনো অধরা! একরোখা অন্ধ জাতীয়তাবাদ, উগ্র জাত্যভিমান বা ধর্মীয় হানাহানি অথবা সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষ প্রসূত নয়- এই মাটির ঐতিহাসিক লড়াই সংগ্রাম। বাংলার মাটি বাংলার জল, সুফি সাধক বাউলের নিমগ্ন ধ্যান জ্ঞান দর্শন ইত্যাদির উর্বর সমন্বিত মানবিক রূপ স্বীকার করে বলতে দ্বিধা নেই- ক্রমাগত আগ্রাসন, অপমান অনাদর, শোষণ বঞ্চনায় সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত সশস্ত্র রূপান্তরের নাম মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ড অর্জনের বা মানচিত্র পরিবর্তনের লড়াই নয়; এটা পরিষ্কার সামন্তবাদ, স্বৈরতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি সামগ্রিক জনযুদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধই জাতিগতভাবে আমাদের সবচেয়ে বড় সুসংহত প্রেরণা। অবশ্যই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়ন জুলাইয়ের বড় অর্জন। পাশাপাশি আরেকটি বড় অর্জন ছিল দেশের রাজনীতিবিমুখ জনগোষ্ঠীর রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া।
বিভিন্ন বাস্তবতায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ রাজনীতিকে ঘৃণা করে বা ভয় পেয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকা বেছে নেয়। তারা বেশ গর্বের সাথে "I hate politics" বলতো। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আবহ তাদেরকে রাজনীতিতে আকৃষ্ট করে তুলে। তারা আশাবাদী হয়, আগ্রহী হয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার।
তারা আশা করেছিল, বাংলাদেশের সম্মুখ যাত্রার। সহিংস রাজনীতির অবসান, শিক্ষা-চিকিৎসা সহ নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের ট্রান্সপারেন্সি ও জবাবদিহিতা ইত্যাদি ছিল তাদের প্রধান চাওতা। ভাষণবাজী নির্ভর রাজনীতির বিপরীতে তারা চেয়েছিল জনসম্পৃক্ত, জনকল্যাণমুখী রাজনীতি; যেখানে সাধারণ মানুষের প্রকৃত সমস্যা ও চাওয়া-পাওয়ার আলোচনা মূখ্য থাকবে।
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই জনগোষ্ঠীকে পুনরায় হতাশ করে। জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে তারা দেশের রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন আশা করেছিল, তার কিছুই তারা দেখতে পায়নি। তাদের আকাঙ্খার কথা শোনার জন্য নতুন পুরোনো কোনো দলই প্রস্তুত ছিল না। হয়ে ফিরে গেছে, ফিরে যাচ্ছে বা কেউ কেউ নতুন একটি খুঁজছে।
আমরা সেই হতাশ জনগোষ্ঠীর প্ল্যাটফর্ম হতে চাই। আমরা তাদের রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণের দরজা হতে চাই। আমরা বাংলাদেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের মাধ্যম হতে চাই। আমরা কোনো ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক মোর্চা নই। বরং এক দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক লড়াইয়ের ঐতিহাসিক ইশতেহার। এই লড়াই ক্ষয়ের বিরুদ্ধে সৃষ্টির, অন্ধকারের বিরুদ্ধে প্রগতির এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাম্যের। বাংলার মাটি ও মানুষের অদম্য প্রাণশক্তিকে সঙ্গী করে আমরা এক নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণমুক্তির এই মহান রাজনৈতিক মিছিলে প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিককে শামিল হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানাই। আমাদের সম্মিলিত লড়াই-ই এনে দেবে বাংলাদেশের প্রকৃত মুক্তি, গড়ে তুলবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
এএম




