নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে মো. শামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে ‘বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট’ উল্লেখ করে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানিয়েছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তার আরও দাবি, ‘বিএনপির ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সঙ্গে বাস্তব কর্মকাণ্ডের কোনো মিল নেই। তারা ‘সবার আগে বিএনপি’ নীতিতেই দল পরিচালনা করছে।’
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার ভিত্তি নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা। কিন্তু সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে মো. শামসুল আলমকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি বিএনপির একটি নির্দিষ্ট কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।’
তিনি মনে করেন, ‘এমন একজন সক্রিয় রাজনীতিককে নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব দেওয়া অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতি প্রতারণার শামিল।’
জামায়াত সেক্রেটারি দাবি করেন, ‘অবিলম্বে এ নিয়োগ বাতিল করতে হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সর্বজনগ্রাহ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।’
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বিএনপির ৩১ দফায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেশবাসী দেখছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ নয়, সবার আগে বিএনপি’। এই নীতির ভিত্তিতেই দেশ পরিচালিত হচ্ছে, যা জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কার, সংবিধান সংস্কার এবং দলীয়করণের অবসানের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকার বাস্তবে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সাংবিধানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দিচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন করপোরেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। এসব নিয়োগের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রভাব বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে প্রত্যাশা করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তার অভিযোগ, জুলাই সনদের ভিত্তিতে জনগণের দেওয়া গণরায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার জনগণের সঙ্গে করা অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনার পরিবর্তে সংবিধানের আলোকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনা করা উচিত। একই সঙ্গে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ বৃদ্ধি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি ও সরকারি সম্পদের বণ্টনেও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ উঠছে, যা সুশাসন ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে সমতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয়করণ বন্ধ, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া নিয়োগ বাতিল, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
টিএই/এএইচ




