আগামী আগস্ট মাসের আগেই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে বাংলাদেশ সম্মেলন ২০২৬-এর দ্বিতীয় অধিবেশনে তিনি এই দাবি করেন।
এ সময় জুলাই গণহত্যাসহ অতীতের রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করতে পাবলিক কমিশন গঠনের দাবি জানান ফুয়াদ।
তার দাবি, ‘এখনো আওয়ামী লীগের বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে আমাদের নাম নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সম্প্রতি আমি নিজেই কিছু স্ক্রিনশট দেখেছি। সেখানে আলোচনা হচ্ছে আগস্টের মধ্যে কীভাবে আমাকে হত্যা করা যায়। ডিসেম্বরের আগে অন্তত দুই-তিনটি লাশ ফেলতে পারলে, সেই লাশের মধ্যে যেন আমারটিও থাকে। এই আলোচনা কোনো সাধারণ কর্মীরা করছে না, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাই করছে।’
তিনি বলেন, ‘তাহলে এই রাষ্ট্রে হিলিং নিয়ে আলোচনা করবে কে? কীভাবে করবে? রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামোর কোথাও তো হিলিং নিয়ে বাস্তব কোনো উদ্যোগ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। অনেকে তাকে ২০২৬ সালের ‘গান্ধী’ বানানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমাদের তো আরেকজন গান্ধীর দরকার ছিল না। গান্ধী থাকলে ২০২৬-ও আসত না। ভারতও কেবল গান্ধীর কারণে স্বাধীন হয়নি, ইতিহাসের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।’
ফুয়াদ বলেন, ‘মূল কথা হলো, আমরা এখনো প্রতিদিন সেই পতিত ফ্যাসিবাদের সঙ্গেই লড়াই করছি। একটি মৃতদেহকে কবর দেওয়ার পরও যেমন হাত-পা কিছুক্ষণ নড়ে, ঠিক তেমনই সেই ফ্যাসিবাদ এখনো নড়াচড়া করছে। দেখবেন, কোনো সিনিয়র সাংবাদিকের ব্যানারে সেই পুরোনো শক্তি আবার মাথা তুলছে। বুদ্ধিজীবীর পরিচয়ে তারা আবার হাজির হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমলা নতুন নতুন পরিচয়ে তারা আবার আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করছে।’
তিনি বলেন, ‘দেখবেন, ৩২ নম্বর নিয়ে নতুন সংলাপ লেখা হচ্ছে। কলকাতা থেকে বই প্রকাশ হচ্ছে। ৩৬-এর গল্প এখনো শেষ হয়নি। রক্ত এখনো শুকায়নি। কিন্তু তারা ইতোমধ্যে নতুন বর্ণনা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছে, কীভাবে আবার ফিরে আসতে হবে। তাই প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতিতে আপনি হিলিং করবেন কখন?’
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘যখন চারদিকে ফ্যাসিবাদের গর্তগুলো এখনো খোলা, সেখান থেকে প্রতিদিন লাভা বের হচ্ছে, তখন আমাকে তো প্রতিদিন সেই লাভা নেভানোর লড়াই করতে হচ্ছে। আমাকে প্রতিদিন ভাবতে হচ্ছে—যদি তারা আবার ফিরে আসে, তাহলে কী হবে? সরকারি দল যে তাদের আর ফিরিয়ে আনবে না, সেই নিশ্চয়তা কোথায়? সেটাও তো আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। এই বাস্তবতায় আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কোন বিষয়টিকে আগে অগ্রাধিকার দেব।’
তার প্রশ্ন, ‘আমি কি আগে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখব? আমি কি আগে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঠেকাব? আমি কি গণমাধ্যমে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ব? নাকি শহীদ ও আহত পরিবারের পুনর্বাসন, হিলিং এবং পুনর্মিলন নিয়ে কথা বলব?’ তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে সবকিছু করা তো সম্ভব নয়। এ কারণেই এই লড়াই দীর্ঘ হবে।’
ফুয়াদ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর অগ্রাধিকার বদলে গেছে। বিএনপি নীতিগতভাবে সংস্কারে বিশ্বাস করে না। আমি এই কথা বহুবার বলেছি। সংস্কার কমিশনের সদস্যদের সামনেও বলেছি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকেও বলেছি। অন-রেকর্ড আল রিয়াজ ভাইকে বলেছি। মজুমদার সাহেবকেও বলেছি। বলেছি, এই সংস্কারের কোনোটি বিএনপি বাস্তবায়ন করবে না।’
তিনি বলেন, ‘তখন অনেকে আমার কথা শুনে হাসাহাসি করেছেন। বলেছেন—সময় বদলে গেছে, জুলাই হয়েছে, তারা কথা দিয়েছে। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই বিএনপি তাদের ৩১ দফার অন্তত সাতটি দফা থেকে সরে এসেছে। জুলাই সনদের কথাই যদি বাদ দিই, তাহলেও এই বাস্তবতা স্পষ্ট।’
ফুয়াদ বলেন , ‘বাংলাদেশে সংঘটিত চারটি বড় রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও গণহত্যার ঘটনায় পৃথক পাবলিক কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, শাপলা চত্বর, পিলখানা, জুলাই গণহত্যা এবং গত ১৫ বছরে বিরোধী নেতাকর্মীদের গুম, ক্রসফায়ার ও নিপীড়নের ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একাধিক বৈঠকে তিনি চারটি পাবলিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে সংসদীয় পাবলিক হিয়ারিংয়ের আদলে কমিশন পরিচালনারও পরামর্শ দেন। সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি।’
ফুয়াদের ভাষ্য, ‘গুম কমিশন ও অন্যান্য তদন্ত কমিশন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা পাওয়া যায় না। কমিশনগুলোকে উন্মুক্ত শুনানির ক্ষমতা দেওয়া হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।’
তিনি বলেন, ‘শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা এখনো চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং ভাতাসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি। অনেক আহত ব্যক্তি বিদেশে চিকিৎসার সুপারিশ পাওয়ার পরও এখনো সে সুযোগ পাননি। এসব বিষয় দ্রুত সমাধান করা উচিৎ।’
ফুয়াদ বলেন, ‘জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ১,৪০০–এর বেশি উল্লেখ করা হলেও সরকারের নিজস্ব হিসাবের সঙ্গে তার পার্থক্য তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত কমিশন গঠন করলে এ ধরনের বিতর্কের সুযোগ থাকত না।’
তিনি বলেন, ‘বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনো কাঠামোগত সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রভাব এখনো বিভিন্ন খাতে সক্রিয় রয়েছে এবং ভিন্ন পরিচয়ে তারা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু পুনর্মিলনের কথা বললেই হবে না; আগে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
এবি পার্টির সেক্রেটারি বলেন, ‘রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখনো এমন পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে হুমকিও অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে কার্যকর ‘হিলিং’ সম্ভব নয়।’
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়নের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে জুলাই-পরবর্তী সংস্কার ও পুনর্গঠনের প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি রয়েছে।’
তিনি ‘তওবা কমিশন’ গঠনেরও প্রস্তাব দেন। তার মতে, ‘যারা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধে জড়িত নয়, তাদের জন্য সামাজিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা ও পুনর্বাসনের একটি কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। তবে হত্যা, নির্যাতন ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
ফুয়াদ বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপ, দক্ষিণ আফ্রিকা ও রুয়ান্ডাসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী একটি নতুন রিকনসিলিয়েশন মডেল তৈরি করা যেতে পারে। পাশাপাশি ক্ষমা পাওয়া ব্যক্তিদের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণহত্যা বা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পরদিনই কোনো দেশে পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দক্ষিণ আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এ ধরনের প্রক্রিয়া গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে।’
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি প্রজন্মগত পরিবর্তন ঘটেছে। তরুণদের প্রত্যাশা, বিচার, সংস্কার ও পুনর্মিলনের মধ্য দিয়েই নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে। বিচার ছাড়া সংস্কার নয়, সংস্কার ছাড়া হিলিং নয়, আর হিলিং ছাড়া নতুন বাংলাদেশ সম্ভব নয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু জুলাই বিপ্লবের সময়কার হত্যাকাণ্ড নয়, গত ১৬ বছরে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিচারিক হত্যাকাণ্ড, তথাকথিত ক্রসফায়ার এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও রাষ্ট্রীয়ভাবে নথিভুক্ত করা জরুরি। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টেশন না হলে ইতিহাস বিকৃত বা অস্বীকারের সুযোগ তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি পর্যায়ের প্রতীকী উদ্যোগের চেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল না করে স্বাধীন ও কার্যকর করা প্রয়োজন, যাতে আইনের শাসন নিশ্চিত হয়।’
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা প্রকাশ করে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার এসব ভুল সংশোধন করে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, যা ভবিষ্যতে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হবে।’
এসময় উপস্থিত ছিলেন- কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজিনার প্রভাষক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ, ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারইকের প্রভাষক নওশীন শর্মিলা রিতু, বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন, ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা।
এম/এএইচ



