- দ্রুত সম্প্রসারণে শৃঙ্খলা রক্ষার নতুন চ্যালেঞ্জ
- ক্যাডারভিত্তিক দল থেকে গণভিত্তিক হওয়ার টানাপোড়েন
- বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা
- দুই জেলা কমিটি বিলুপ্ত, বহু নেতা শাস্তির মুখে
- স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে বাড়ছে দলীয় সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতা
- শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর বার্তা আমিরের
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের একটি আদর্শিক, ক্যাডারভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত করে এসেছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলটি কঠোর সাংগঠনিক নিয়ম, ধাপে ধাপে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং আদর্শভিত্তিক কর্মী গড়ে তোলার নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলটির অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ, বিদ্রোহী প্রার্থী, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, নতুন সদস্যদের আচরণ এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের মতো ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। এ ছাড়া দলটি থেকে নির্বাচিত কিছু সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ‘সুশৃঙ্খল দল’ হিসেবে জামায়াতের যে ভাবমূর্তি ছিল, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দলটির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। দলীয় নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ বছর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে দলটির সাংগঠনিক বিস্তার আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান বিতরণকে ঘিরে একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনুদানপ্রাপ্তদের তালিকায় তার মেয়ের নাম রয়েছে—এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয়। পরে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তার ব্যক্তিগত সহকারীকে বরখাস্ত করা হয়। ঘটনাটি দলীয়ভাবে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির বিষয়টিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
গত ২৩ জুন রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্থানীয় জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিলের পর তর্ক-বিতর্ক থেকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় চার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ ঘটনায় জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে প্রার্থী হওয়ায় কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা কমিটি বিলুপ্ত করে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এর পরও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় দলীয় সমর্থন পাওয়ার জন্য তদবির ও প্রচারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও দলীয় শৃঙ্খলা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি নিয়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানও প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, কেউ যদি মনে করেন যে তাকেই জনপ্রতিনিধি হতে হবে, তাহলে তিনি ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। তার বক্তব্যের মাধ্যমে দলীয় আদর্শ ও ব্যক্তিগত পদলাভের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অনেকেই এখন আদর্শের কারণে নয়, বরং সম্ভাব্য ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার আশায় দলে যোগ দিতে চাইছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও চেয়ারম্যান বা অন্যান্য পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। এতে দলীয় আদর্শ ও নতুন যোগদানকারীদের উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
দলের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সরাসরি দলের সদস্য হতে পারেন না। প্রথমে তাকে সহযোগী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর নির্ধারিত ধর্মীয় ও সাংগঠনিক পাঠ শেষ করে কর্মী হতে হয়। পরবর্তী ধাপে রুকন হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক বই অধ্যয়ন, কোরআন তিলাওয়াত, জামাতে নামাজ, সাংগঠনিক কাজের রিপোর্ট এবং নতুন কর্মী তৈরির মতো শর্ত পূরণ করতে হয়। এরপরই নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একইভাবে আমিরসহ বিভিন্ন পদেও গোপন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হয় এবং সেখানে কেউ নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দল সম্প্রসারণের প্রয়োজনে এই কঠোর প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শিথিল হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে তুলনামূলক দ্রুত সহযোগী সদস্য গ্রহণ করা হয়েছে বলে কয়েকজন নেতা মন্তব্য করেছেন। তাদের দাবি, অতীতে যারা দলের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত ছিলেন না, তারাও এখন স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় সমর্থন চাইছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়াই নিজেদের প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে নির্বাচনের সময় নতুন সমর্থকদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। ভোটে ভালো ফল করার লক্ষ্যে বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষকে প্রচারণায় যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় বা কর্মকাণ্ড সব সময় যাচাই করা হয়নি। পরে তাদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার রাজনৈতিক দায়ও দলকে বহন করতে হচ্ছে। সম্প্রতি নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী প্রার্থীদের ঘিরে স্থানীয়ভাবে নতুন বলয় তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। একটি সংসদীয় আসনে নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক কর্মী প্রয়োজন হয়, যা কেবল দলীয় সদস্যদের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে নির্বাচনের সময় অনেক অদলীয় ব্যক্তি যুক্ত হয়েছেন। নির্বাচনের পর তাদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী বলয় তৈরি করছেন, যা পুরোনো সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।
জামায়াতের গঠনতন্ত্রে দলীয় পদ কিংবা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করাকেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কোনো সদস্য নিজে থেকে প্রার্থী হওয়ার প্রচারণা চালাতে বা ভোট চাইতে পারেন না। দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়ম কার্যকর থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের পর, বেশ কয়েকজন নেতার মধ্যে এ নিয়ম ভাঙার প্রবণতা দেখা যায়। দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে নির্বাচন করার ঘটনাও ঘটে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর ঘটনা সামনে এসেছে। সুনামগঞ্জ, নরসিংদী ও চট্টগ্রামের কয়েকটি আসনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারও সদস্যপদ বাতিল, কারও বহিষ্কার এবং কোথাও পুরো জেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। ময়মনসিংহের একটি আসনে দলটির ইতিহাসে প্রথম বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। আবার কুমিল্লার একটি আসনে সম্ভাব্য দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে আসনটি জোটের শরিককে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-১ আসন জোটের শরিক নেজামে ইসলাম পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল জামায়াত। কিন্তু জামায়াতের জেলা আমির তোফায়েল আহমদ শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। নেতাকর্মীর চাপ রয়েছে দাবি করে নির্বাচনে থেকে যান। একই চিত্র ছিল নরসিংদী-২ আসনে। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারকে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হলেও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আমজাদ হোসেন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। তাকে জামায়াতের আমির ঢাকায় ডাকলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে এনসিপির পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দেন। কিন্তু নির্বাচনের সাত দিন আগে নেতাকর্মীর চাপের কথা বলে ভোটের মাঠে নামেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছেন, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের মতে, ব্যক্তিগত পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে, কিন্তু সেটি যদি সাংগঠনিক নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে দল বড় হওয়ার চেয়ে আদর্শ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রতিবেদনের সামগ্রিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্রুত সম্প্রসারণের সুযোগ যেমন জামায়াতের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি সেই সম্প্রসারণই দলটির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে।
এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে সংগঠন বিভিন্ন জায়গায় ব্যবস্থা নিচ্ছে। দুটি জেলা কমিটি বাতিল করা হয়েছে। কমিটির প্রত্যেক নেতাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। নতুন কমিটি দেওয়া হয়নি। সাংগঠনিক অঞ্চলের দায়িত্বশীলরা দেখভাল করছেন।
টিএই/এএস




