বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই সনদের আংশিক বাস্তবায়ন নয়, বরং গণভোটে জনগণের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে। গণভোটে দেশের বিপুলসংখ্যক ভোটার যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে মত দিয়েছেন, সেগুলো উপেক্ষা করে কেবল নির্বাচনি রাজনীতির সুবিধা অনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়া পরিচালনার চেষ্টা করা হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
রোববার (১৪ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে সেন্টার ফর মিডিয়া, ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি আয়োজিত ‘তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার: একটি জনমুখী ও সংস্কারমূলক রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিজ্ঞাপন
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণ সংস্কারের প্রত্যাশা থেকেই বিভিন্ন প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় সেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা আগে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তারাই এখন বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে সংস্কার উদ্যোগকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। জনগণ যে বিষয়ে মত দিয়েছে, তা পরে সংবিধান, আইনি ব্যাখ্যা বা রাজনৈতিক সুবিধার অজুহাতে অস্বীকার করা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ হতে পারে না।
তিনি বলেন, গণভোটে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও বিচারিক সংস্কারও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু রাজনৈতিক দল ওই বিষয়গুলোতে আপত্তি জানিয়ে সংস্কারের মূল চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। গণভোটের রায়ে জনগণ যেসব প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে, সেটিই চূড়ান্ত রাজনৈতিক নির্দেশনা হওয়া উচিত।
গণমাধ্যম সংস্কারের প্রসঙ্গে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার এখনো বাস্তব অগ্রগতি দেখতে পায়নি। যদিও এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও বিভিন্ন প্রস্তাবনা সামনে এসেছে, তবুও সেগুলো কার্যকর করার উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। রাজনৈতিক সংস্কার, বিচার বিভাগীয় সংস্কার এবং সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে গণমাধ্যম সংস্কারও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
‘তথ্য ও সম্প্রচার খাত সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ৬০টির বেশি প্রস্তাব আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে জনগণের গণমাধ্যমে রূপান্তর, সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, স্বাধীন মিডিয়া কমিশন বা কাউন্সিল গঠন, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা, তথ্য অধিকার আইন ও সম্প্রচার নীতিমালার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক কাঠামো গঠনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল,’ যোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে সত্য ও নির্ভুল তথ্য জানানো। কিন্তু বর্তমানে অনেক গণমাধ্যম করপোরেট বা রাজনৈতিক স্বার্থের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারছে না। ফলে সংবাদ পরিবেশনে নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতি সততা, পেশাদারিত্ব ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জামায়াতের এই নেতা বলেন, উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় দৈনিক আজাদ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে দৈনিক ইত্তেফাক জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। এসব গণমাধ্যমের পেছনে করপোরেট বা ব্যবসায়িক স্বার্থ নয়, বরং রাজনৈতিক ও জাতীয় লক্ষ্য কাজ করেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে তথ্যপ্রবাহের বড় একটি অংশ সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেখানে সম্পাদকীয় নীতি, জবাবদিহিতা ও তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের ঝুঁকি বাড়ছে। এই বাস্তবতায় মূলধারার গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে হবে।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, সাংবাদিকতাকে বিশ্বব্যাপী সভ্যতার মানদণ্ড, জাতির বিবেক এবং গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নৈতিকতার সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বার্থনির্ভর সংবাদ পরিবেশনের কারণে গণমাধ্যম তার কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা হারাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা, জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম ব্যবস্থা এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন লেখক ও সাংবাদিক আবুল আসাদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. খাদেমুল ইসলাম হৃদয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর, একুশে টেলিভিশনের হেড অব নিউজ হারুনুর রশিদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, ঢাকা মেইলের সম্পাদক হারুন জামিলসহ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।
এএইচ/এএস




