রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

ক্ষমতাসীনরা সব শর্ত মেনে নিয়ে এখন বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না: হাসনাত

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩ মে ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ক্ষমতাসীনরা সব শর্ত মেনে নিয়ে এখন বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না: হাসনাত
বক্তব্য দিচ্ছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ক্ষমতাসীনরা তখন যেসব শর্ত ও প্রস্তাব সামনে এসেছিল, সেগুলোই বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল যেকোনোভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা; সে কারণে তখনকার সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও সংস্কারের অঙ্গীকার এখন আর বাস্তবায়নের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

রোববার (৩ মে) রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজিত ' নিরাপত্তা: বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যত করণীয়' শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে এক বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 


বিজ্ঞাপন


সেশনটি সঞ্চালনা করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ। সেশনে প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য দেন ‘জাতীয় অর্থনীতি’ পত্রিকার সম্পাদক ইসমাইল আলী, ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি ইকনমিকস অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম এবং এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ প্রমুখ।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নির্বাচন হওয়ার জন্য উনারা তখন যা বলেছে, সেটা মেনে নিয়েছে। মানে যা বলা হয়েছে, সবই মেনে নিয়েছে—শুধুমাত্র নির্বাচনটা যেন হয়ে যায়। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক ভণ্ডামির উদাহরণ, যেখানে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আপস করা হলেও পরে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি।

জ্বালানি খাতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ডিজেলসহ জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের ভেতরে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী কাজ করে। অনেক আমলা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন এবং নীতিনির্ধারণে নিজেদের স্বার্থ প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেন। যদিও তিনি স্বীকার করেন, সব আমলাই এমন নন; অনেকেই দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছেন। তবে একটি অংশের কারণে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।


বিজ্ঞাপন


তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে নির্ভরতা কমাতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, অন্তত ৭ থেকে ৯ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা গেলে দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা অনেক সহজ হবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষায়, বর্তমানে সরকারের ভেতরে একাধিক শক্তিকেন্দ্র রয়েছে, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্পষ্টতা তৈরি হচ্ছে। আগে অন্তত বোঝা যেত শেষ সিদ্ধান্তটা কে নেয়, এখন মনে হয় সরকারে সরকারের ভেতরেই একাধিক সরকার আছে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে সরকারের ব্যর্থতার দায় প্রধানমন্ত্রীকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে অন্যদের ওপর চাপানোর প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তার মতে, সরকারের আশপাশে এমন কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা জনআকাঙ্ক্ষা থেকে সরকারকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে।

সংস্কার কার্যক্রম প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যে কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, তার বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। তিনি উল্লেখ করেন, পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। একইভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তাদের পেশাগত সুরক্ষা ও স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পুলিশ সদস্যদের পোস্টিং, পদোন্নতি ও বদলি এখনো রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে আসেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বিচার বিভাগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাগজে-কলমে স্বাধীনতা থাকলেও বাস্তবে বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করা হয়। এতে করে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীনতা পায় না।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যেসব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বড় একটি অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। এতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকরাও নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। যারা ভোট দিয়েছে তারাও এখন নিজেদের চিটেড ফিল করছে। কারণ তারা ভেবেছিল পরিবর্তন আসবে, কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, শুধু সংসদের ভেতরে নয়, সংসদের বাইরেও সংস্কারের দাবিতে সক্রিয় থাকতে হবে। রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে নাগরিক সমাজকে আরও সংগঠিত হতে হবে। এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ হবে না এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এককভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

এএইচ/এআর

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর